বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০২টি দেশে পণ্য রফতানি করেছে। আজ সোমবার সংসদে জামালপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি রফতানি বাজার সম্প্রসারণ এবং একটি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

মন্ত্রী বলেন, দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে আসে। এ নির্ভরতা কমাতে সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ শিল্প, আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে একই ধরনের নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনার আলোকে এসব খাতের আংশিক রফতানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড সুবিধা দেয়া হয়েছে।

আঞ্চলিক রফতানি বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে জাপানের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের আদলে ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট (ওডিওপি)’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় দেশের ৬৪ জেলার জন্য ইতোমধ্যে ১৪টি পণ্য চিহ্নিত করা হয়েছে।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের ফলে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানিকে প্রভাবিত করতে পারে।

এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ চুক্তির আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি সদস্য দেশসমূহ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ অন্যান্য সম্ভাব্য বাজারের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, টেকসই রফতানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে রফতানি নীতি ২০২৪-২০২৭ প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রচলিত বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরে নতুন বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিআইএসভুক্ত দেশ এবং বিভিন্ন আফ্রিকান দেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।

মন্ত্রী বলেন, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও সিআইএসভুক্ত দেশগুলোতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ বাণিজ্য প্রতিনিধি দল পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও সিআইএস অঞ্চলে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি জানান, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সিআইপি মর্যাদা ও এক্সপোর্ট ট্রফি প্রদানের মাধ্যমে রফতানিকারকদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। রফতানিকারকদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, কাঁচামাল আমদানিতে সহায়তার জন্য এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া রফতানিমুখী শিল্পের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ‘৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট ঋণ তহবিল’ গঠন করেছে, যেখানে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা হয়েছে এবং বাণিজ্য উইংগুলো রফতানি বৃদ্ধি ও বাংলাদেশী পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ে কাজ করছে।

পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ‘পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং প্রোডাক্টস’কে ২০২৬ সালের বর্ষসেরা রফতানি পণ্য ঘোষণা করেছে।

তিনি আরো জানান, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজন অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ আয়োজন করেছে, যা রফতানি উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সময়ে ইপিবি ৪৬টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে তাদের ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার পার্শ্ব-আয়োজন হিসেবে ৮টি সেমিনারের আয়োজন করেছে। মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে (গ্লোবাল ভ্যালু চেইন) অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং রফতানিনির্ভর বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এফটিএ, ইপিএ ও সিইপিএভিত্তিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

এলডিসি উত্তরণ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম মেনে নগদ সহায়তার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত বিকল্প প্রণোদনা ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরো গভীর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে এলডিসি-উত্তর সময়ে বাংলাদেশ নির্বিঘ্ন ও টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

এছাড়া জিসিসি, মার্কোসুরভুক্ত দেশ, রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। ভিয়েতনাম, হংকং, তুরস্ক ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও যথাসময়ে সরকারি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান।