প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাজারব্যবস্থার অনিবার্য ফল নয়; বরং এটি পরিকল্পিত নীতিগত সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার অসম বণ্টন এবং সংকটের সময় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ফল। দারিদ্র্য কমাতে হলে ক্ষমতার অসম বণ্টন ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো জরুরি।

থাইল্যান্ডের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের যৌথ আয়োজনে ‘অ্যান এশিয়া ফর এভরিওয়ান: পাবলিক সার্ভিসেস, সোশ্যাল প্রটেকশন অ্যান্ড দ্য প্রমিজ অব শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

সম্মেলনে গবেষক, আইনপ্রণেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আয়বৈষম্য নিয়ে প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে সরকারি সম্পদ ও সেবা বণ্টনের ব্যবস্থাও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘মূলত নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই বৈষম্য তৈরি হয়।’ বৈষম্য মোকাবেলায় ক্ষমতার অসম বণ্টন এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

দেশীয় অর্থনীতিতে বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ কম এবং করব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের অব্যাহতি রয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও বিত্তবানদের সুবিধা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল করব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর প্রবণতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়োগের মাধ্যমে কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানান্তর মূল্য নির্ধারণের অপব্যবহার এবং বিভিন্ন কর অব্যাহতি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সম্পদ বাড়াচ্ছে, যার বিপরীতে জনকল্যাণমূলক খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা নিয়েও সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা। তার মতে, ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলো বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়লেও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষিতে সাত মাসে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় অতিরিক্ত ৪১২ কোটি ডলার বেড়েছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ১৮২ কোটি ডলার, তেল আমদানিতে ২২১ কোটি ডলার এবং সার আমদানিতে প্রায় ৭ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

তিনি বলেন, এর জন্য কি বাংলাদেশের মানুষ দায়ী? না। তাহলে সাত মাসে অতিরিক্ত এ ৪১২ কোটি ডলারের ব্যয় সরকার কীভাবে মেটাবে? এ ধরনের পরিস্থিতিতে কার্যকর বহুপক্ষীয় উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমান বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় জবাবদিহিমূলক সরকারগুলোও চাপে পড়ে জানিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম পুরোপুরি বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করলে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও পণ্য ও সেবা করের (জিএসটি) মতো ভোগনির্ভর করের বোঝাও বহন করতে হয় তাদের।

কোভিড-পরবর্তী অভিঘাত ও আগের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ৭০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি জীবনচক্রভিত্তিক সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন খাতে এমন বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং করের আওতা বাড়াবে। তার মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো গেলে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকেও টেকসই করা সম্ভব হবে।