বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকরের কারণে বিভিন্ন শিল্প-কারখানাসহ পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে বেশির ভাগ সময়ই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যায় না। কখনো জরিমানা পরিশোধ করে, কখনো মামলার বিরুদ্ধে আপিল করে অভিযুক্ত কলকারখানাগুলো তাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। আবার পরিবেশ অধিদপ্তরও লোকবল সংকটসহ নানা কারণে এসব তদারক করতে পারে না। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সংশ্লিষ্ট একটি ধারার বিষয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ফলে এখন থেকে পরিবেশ দূষণে অভিযুক্ত কোনো কলকারখানা মামলা চলাকালে কারখানা চালু রাখার ছাড়পত্র পাবে না।
৬ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. শওকতুল আম্বিয়া স্বাক্ষরিত এক স্মারকে এসব নির্দেশনার কথা জানানো হয়। ওই স্মারকে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ১৪ ধারার রিট মামলা অনিষ্পন্ন থাকাবস্থায় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন কিংবা নবায়নের আবেদন গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ, ছাড়পত্র ইস্যু বা নবায়ন ও ক্ষতিপূরণ আদায় করার ক্ষেত্রে মোট সাতটি নির্দেশনা দেয়া হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে আগের কোনো আবেদন অনিষ্পন্ন থাকলে সে অবস্থায় একই বিষয়ে নতুন করে কোনো আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা যাবে না। তবে আগে দাখিল করা আবেদনের জের ধরে প্রাসঙ্গিক তথ্য জমা দেয়া যাবে।
এছাড়া আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল চলমান অবস্থায় অথবা আপিল কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট বা আপিল মামলা বিচারাধীন থাকলে সে বিষয়ে অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র ইস্যু বা নবায়ন করা যাবে না। তবে সার্বিক বিবেচনায় আপিল কর্তৃপক্ষ যদি ছাড়পত্র ইস্যু বা নবায়নের নির্দেশ দেয়, তাহলে তাতে আর কোনো বাধা থাকবে না।
কোনো কলকারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের যে অভিযোগ করা হবে সেটি যদি তারা বন্ধ করে দেয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সব নিয়ম মেনে চলে, তাহলে ছাড়পত্র পেতে কোনো বাধা থাকবে না বলেও স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া আপিল কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ ধার্য করলে তা পরিশোধ করে এরপর ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে পারবে কলকারখানাগুলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতদিন কোনো কলকারখানা কিংবা প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ করলে তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা বা জরিমানা করত। দূষণকারীরা এসব মামলা বা জরিমানার রিট করতেন। এর মাধ্যমে কখনো কখনো জরিমানা মওকুফ হতো আবার দীর্ঘদিন ধরে মামলা ঝুলিয়ে রাখা হতো। এসবের পাশাপাশি অব্যাহত থাকত তাদের দূষণ।
উদাহরণ হিসেবে রাজধানীর শ্যামপুরের একটি ডায়িং ও টেক্সটাইল কারখানার কথা উল্লেখ করা যায়। পরিবেশ দূষণের দায়ে তিনবার জরিমানা করা হয়েছে তাদের। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকা, নির্গত তরল বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপসহ নানা অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। তিন দফায় তাদের কয়েক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এর পরও দূষণ বন্ধ করেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার কখনো জরিমানা মওকুফ করিয়ে, কখনো কমিয়ে বা পরিশোধ করে হলেও কারখানা চালু রেখেছিল। এভাবেই আইনের ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সচল থাকছে। সে কারণে বিদ্যমান আইনে আনা হয়েছে সংশোধনী।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ বছরে পরিবেশ দূষণ রোধে ৭ হাজার ৩৫৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৩৮৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ। এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ১৮৭ কোটি টাকা।
মূলত মামলা জটিলতার কারণেই ধার্য করা জরিমানা আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এনফোর্সমেন্ট বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করার পর তারা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত আপিল আদালতে মামলা করে জরিমানার পরিমাণ কমিয়ে নেন। এছাড়া দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদনের মাধ্যমেও জরিমানা মওকুফ করিয়ে নেন। আবার অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান জরিমানা দেয়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেই দূষণ ও কারখানার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ রোধ করা জরুরি। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রাও অব্যাহত রাখতে হবে। অধিদপ্তরের নতুন নির্দেশনার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই এ দুটো সম্ভব।
নির্দেশনা জারি হওয়াকে আশার আলো হিসেবে উল্লেখ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খোন্দকার মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, এসব বাস্তবায়ন করতে পারাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। সেদিকে আমাদের উন্নতি করতে হবে। আমরা পরিবেশ আইনটি সংশোধনের কাজে হাত দিয়েছি। আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের পরিবেশ দূষণের চিত্র বদলে যাবে। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় আছি।










