দেশে রফতানি পণ্যের মধ্যে অন্যতম চিংড়ি। বেশ কয়েক বছর আগে থেকে নড়াইলের মিঠাপানিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে গলদা চিংড়ির। এক দশকে জেলায় চিংড়ি চাষ বেড়েছে। এসব চিংড়ি রফতানি হচ্ছে জাপান, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় ২০টি চিংড়ি বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা এসব আড়ত থেকে চিংড়ি কিনে নিয়ে যান। বছরে অন্তত ৭০০ কোটি টাকার চিংড়ি বিক্রি করছেন নড়াইলের মৎস্যচাষীরা। লাভবান হওয়ায় প্রতি বছরই চিংড়ি চাষ বাড়ছে এ জনপদে।
নড়াইল মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১০ বছর আগে জেলায় ঘেরের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮০০। এক দশকের ব্যবধানে ঘেরের সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ৫৯১। বর্তমানে ২ হাজার ২৮৭ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৩৯১টি ঘের রয়েছে। এ পেশার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। প্রতি বছর এ জেলা থেকে অন্তত ৭০০ কোটি টাকার চিংড়ি বেচাকেনা হয়।
চিংড়ি চাষীরা জানান, নব্বই দশকের শুরুর দিকে নড়াইলে হাতে গোনা কয়েকজন মৎস্য চাষী চিংড়ি চাষের উদ্যোগ নেন। প্রথমে স্বল্প পরিসরে মিঠাপানিতে গলদা চিংড়ির চাষ শুরু করেন। তাদের সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকরাও চাষ শুরু করেন। মিঠাপানির গলদা চিংড়ি খেতে সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি দেশে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। দেশ-বিদেশে সাদা সোনাখ্যাত গলদা চিংড়ির ব্যাপক চাহিদা থাকায় দিন দিন ঘেরের সংখ্যাও বেড়েছে।
লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ি গ্রামের চিংড়ি চাষী জিরু শেখ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১০ বছর আগে থেকে চিংড়ি চাষ করছি। প্রথমে ৫৪ শতক জমিতে ঘের তৈরি করে চাষ শুরু করেছি। প্রথম দিকে লাভ ভালো হওয়ায় প্রতি বছর ঘেরের সংখ্যা বাড়িয়েছি। বর্তমানে পাঁচ একর (৫০০ শতাংশ) জমিতে সাতটি ঘের তৈরি করে চিংড়ি চাষ করছি।’
একই গ্রামের আরেক চাষী আমিনুজ্জামান বলেন, ‘এ গ্রামের প্রতিটা কৃষকই ধান-পাটসহ অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি চিংড়ি চাষ করেন। ধান-পাটের তুলনায় চিংড়ি চাষ লাভজনক। এজন্য দিন দিন চিংড়ি চাষ বাড়ছে।’
নড়াইল পৌর এলাকার চাষী আজিজুর জানান, নড়াইলের চাষীদের চিংড়ি বিক্রি করার জন্য কোথাও যাওয়া লাগে না। এলাকায় বেশ কয়েকটি চিংড়ি বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব বিক্রয় কেন্দ্র থেকে ব্যবসায়ীরা চিংড়ি কিনে নিয়ে যান। চিংড়ি ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘এলাকায় কয়েক শ ব্যবসায়ী আছেন, তারা স্থানীয় চাষীদের কাছ থেকে চিংড়ি কিনে বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধির কাছে বিক্রি করেন।’
ব্যবসায়ী লিটন ফকির বলেন, ‘নড়াইলের উৎপাদিত চিংড়ি বেশির ভাগ খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কোম্পানিতে চলে যায়। সেখান থেকে বড় বড় কোম্পানির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়।’
নড়াইল ঘের মালিক সমিতির সভাপতি আকরাম শহিদ চুন্নু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নড়াইলে ব্যাপকভাবে চিংড়ি উৎপাদন হলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য সুনাম নষ্ট হচ্ছে। কিছু কিছু ব্যবসায়ী ওজন বাড়ানোর জন্য চিংড়ির সঙ্গে জেলি ও ছোট ছোট পাথর মিশিয়ে বিদেশে রফতানি করছে। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের চিংড়ির বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবাই মিলে এসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। প্রতি বছরই নড়াইলে চিংড়ি চাষ বাড়ছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সবাই লাভবান হবে।’
ঘের মালিক সমিতির নেতা শরীফ মুনির হোসেন বলেন, ‘পাঁচটি গ্রেডে চিংড়ি ভাগ করা হয়। পাঁচ নম্বর গ্রেডের (পাঁচটিতে এক কেজি) চিংড়ির দাম ১ হাজার ৫০০-১ হাজার ৮০০ টাকা। ১০ নম্বর গ্রেডের চিংড়ির দাম ১ হাজার ২০০-১ হাজার ৪০০, ১৫ নম্বর গ্রেডের দাম ৮০০-১ হাজার ১০০, ২০ নম্বর গ্রেড ৬০০-৭০০ ও ৩০ নম্বর গ্রেডের চিংড়ির দাম ৪০০-৫০০ টাকা।’
নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এইচএম বদরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নড়াইলের পানি ও মাটি গলদা চিংড়ি চাষে খুব উপযোগী। জেলার বিভিন্ন বিলের নিচু যেসব এলাকায় ফসল উৎপাদন কম হতো, সেখানে প্রান্তিক চাষীরা ঘের তৈরি মিঠাপানিতে গলদা চিংড়ির চাষ করছেন। ১০ বছরে এখানে চিংড়ি চাষ কয়েক গুণ বেড়েছে। এ চাষ বাড়ানোর জন্য চাষীদের সবসময় মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়।’










