২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার মতো চেষ্টা দেখা যায়নি; বরং বিদেশ থেকে পণ্য এনে সংযোজন (অ্যাসেম্বলিং) ও বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করাকে বেশি উৎসাহিত করা হয়েছে। এমন মন্তব্য করেছেন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)-এর সভাপতি লুতফুন নিসা সৌদীয়া খান। তিনি বলেন, বাজেট প্রস্তাবনায় দেশের নিজস্ব শিল্পগুলো উৎসাহিত করার মত কিছু দেখা যায়নি, যা সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক।
আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অনুষ্ঠিত ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেছেন। আইবিএফবি আয়োজিত এ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, আইবিএফবির সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশীদ, বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফাইন্যান্স) উৎপল কুমার দাস এবং গভর্নমেন্টাল রিলেশন অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি কমিটির চেয়ারম্যান এম এস সিদ্দিকী।
বাজেটের কিছু সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে লুতফুন নিসা বলেন, করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা এবং সারা বছর রিটার্ন দেয়ার সুযোগ রাখা অত্যন্ত জনবান্ধব হয়েছে। বর্তমানে স্টার্টআপ ব্যবসার পরিধি ও ভলিউম অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় এই কোম্পানিগুলোর জন্য বড় অঙ্কের ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করাকে তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
আবদুল মজিদ বলেন, বাজেটের প্রকৃত সাফল্য বিশাল অংকের চেয়ে এর ‘ফলাফলমুখী’ বাস্তবায়নের ওপর বেশি নির্ভরশীল, যেখানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং স্বাস্থ্য খাতের মাধ্যমে জনগণের পকেট থেকে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় কমানো জরুরি। বর্তমানে দেশে বিপুলসংখ্যক বেকার থাকা সত্ত্বেও বিদেশী কর্মীরা এদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স নিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি দ্বিমুখী ক্ষতি। অন্যদিকে বিআরটিএ, রেলওয়ে বা পেট্রোবাংলার মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো লাভের জন্য তৈরি হলেও তারা সঠিক রাজস্ব দিতে পারছে না।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি জানায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং এলডিসি-উত্তরণের প্রস্তুতির মতো এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। এই সন্ধিক্ষণে ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের প্রকৃত সফলতা শেষ পর্যন্ত তিনটি প্রধান বিষয়— কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সুশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভর করবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিতে সাধুবাদ জানিয়েছে আইবিএফবি। এছাড়া ৪ লাখ নারীর জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা, ৫ বছরের ব্যক্তিশ্রেণির কর কাঠামো একসঙ্গে ঘোষণা, স্টার্টআপ তহবিলের জন্য ৪০০ কোটি টাকা এবং এসএমই খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্তকেও সংগঠনটি স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড যানবাহন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ছাড়ের মতো দূরদর্শী উদ্যোগগুলোর প্রশংসাও করা হয়েছে।
আইবিএফবি বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি মনে করে, বর্তমান বাস্তবতায় ৬ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং কর নীতি ও প্রশাসনের ব্যাপক সংস্কার ছাড়া তা অর্জন করা কঠিন। এছাড়া সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রাপ্যতা কমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংগঠনটির মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা ও ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ খেলাপি ঋণ; এই খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং বাজেটের কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে আইবিএফবি। এর মধ্যে রয়েছে হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত কর ব্যবস্থার জন্য পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, করহার না বাড়িয়ে নতুন করদাতা খোঁজার মাধ্যমে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং এনবিআরকে একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এছাড়া ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা, বন্দরগুলোয় ২৪/৭ কাস্টমস সুবিধা চালু করা, তৈরি পোশাকের বাইরে রফতানি বহুমুখীকরণে বিশেষ প্রণোদনা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে।










