নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, সরবরাহ চেইনে সংকট, মহামারীর রেশ কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বেশ লম্বা সময় ধরে অস্থির বিশ্ববাজার। বিশেষ করে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য হিসেবে পরিচিত ভোজ্যতেলের দাম গত এক বছর ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে গত দুই মাস বিশ্ববাজারে দীর্ঘদিনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থেকে নিম্নমুখী ধারায় ফিরেছে সয়াবিন ও পাম অয়েলের বুকিং দর। মূলত যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি নতুন মৌসুমের আগে বাড়তি উৎপাদন ও মজুদ ছাড়তেই বুকিং দরে এ পরিবর্তন। তবে বিশ্ববাজারে বুকিং দর বাড়লে দাম বাড়াতে তত্পরতা দেখা গেলেও বুকিং দর কমলে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমানোর ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরে চলো নীতিতে থাকে আমদানিকারক ও সরকারি সংস্থাগুলো। ফলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের রেশ এখনো এসে পড়েনি বাংলাদেশের বাজারে।



এদিকে নিজের দেশে ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় করতে গত ২২ এপ্রিল পাম অয়েল রফতানি বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়া। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, ইন্দোনেশিয়ার এ সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তেমন দেখা যায়নি। বরং দেশের পামচাষীদের বিরোধিতার মুখে পড়ে ইন্দোনেশিয়া সরকার। প্রায় তিন সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে গত ২৩ মে আবারো পাম অয়েল রফতানি শুরু করে দেশটি। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেও রফতানি কার্যক্রম কিছুটা ধীর রয়েছে। রফতানি স্বাভাবিক করতে পাম অয়েল রফতানি নীতিমালা আরো শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। ফলে এখন থেকে বেশ কয়েকটি ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী কোম্পানি পণ্যটি রফতানির জন্য অনুমোদন পাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পর্যাপ্ত পরিমাণে বজায় রাখতে বিভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করেছিল ইন্দোনেশিয়া সরকার। সেই সঙ্গে দেয়া হয়েছিল আমদানি নিষেধাজ্ঞাও। এ অবস্থায় স্থানীয় মজুদাগারগুলো পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন মৌসুমের আগে তাই রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে মজুদ ছেড়ে দেয়া হবে। এজন্যই নীতিমালা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।

ইনডেক্স মুন্ডির তথ্য বলছে, সর্বশেষ ১১ জুন পর্যন্ত অপরিশোধিত পাম অয়েলের বুকিং দর ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৩৫৯ দশমিক ৭৫ ডলার। যদিও চলতি বছরের মার্চে ছিল ১ হাজার ৭৭৭ ডলার, এপ্রিলে ১ হাজার ৬৮৩ ও মে মাসে ছিল ১ হাজার ৭১৭ ডলার। অন্যদিকে সর্বশেষ লেনদেনে সয়াবিনের বুকিং দর ছিল ১ হাজার ৭৮১ ডলার। গত মার্চে এর টনপ্রতি বুকিং দর ছিল ১ হাজার ৯৫৭ ডলার, এপ্রিলে ১ হাজার ৯৪৮ ও মে মাসে ছিল ১ হাজার ৯৬৩ ডলার। এক্ষেত্রে কয়েক মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের টনপ্রতি দাম কমেছে ৪১৮ ডলার ও সয়াবিনের ১৭৬ ডলার।

পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি দর কমেছে মালয়েশিয়ান অপরিশোধিত পাম অয়েলের। ইনভেস্টিং ডটকমের তথ্যমতে, গত বছরের আগস্টে সরবরাহযোগ্য পাম অয়েলের টনপ্রতি দাম কমে লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ৮৩০ রিঙ্গিত বা ১ হাজার ৩২৪ ডলারে (এলসি মূল্য)। এছাড়া সেপ্টেম্বরে সরবরাহযোগ্য পাম অয়েল লেনদেন হয়েছে টনপ্রতি ৫ হাজার ৭০৪ রিঙ্গিত বা ১ হাজার ২৯৫ ডলারে। কয়েক মাস আগেও মালয়েশিয়ান পাম অয়েলের সর্বোচ্চ এলসি মূল্য ৭ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত ঠেকেছিল। ইন্দোনেশিয়া রফতানি শুরুর পাশাপাশি শুল্ক ছাড়জনিত ঘোষণায় সর্বোচ্চ সেই মূল্য থেকে কমতে কমতে এখন ৫ হাজার ৭০০ রিঙ্গিতে নেমেছে। চাহিদা কমলেও উৎপাদন বাড়তে থাকায় বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম আরো কমার পূর্বাভাস দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন কমোডিটি এক্সচেঞ্জ।

বিশ্ববাজারে ধারাবাহিকভাবে দাম কমলেও দেশের বাজারে এখনো এর কোনো প্রভাব নেই। কারণ হিসেবে খাতুনগঞ্জের একাধিক ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী বলছেন, বিশ্ববাজারে চলতি মাস থেকে তিন মাস পিছিয়ে এলসির ভোজ্যতেল সরবরাহ করা হয়। যদিও দেশের ব্যবসায়ীরা এক মাস আগের দাম প্রস্তাব করে ভোজ্যতেল বিক্রির দাম সমন্বয় করেন। বিশ্ববাজারে কোনো মাসে স্পট হিসেবে যে দামে ভোজ্যতেল বিক্রি হয় সেটি আসলে স্থানীয় বাজারের জন্য নির্ধারিত। স্পট মার্কেটে অধিকাংশ সময়ই দাম বেশি থাকায় ওই দামের সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় করে আমদানিকারকরা অতিমুনাফা করছেন।

বিশ্ববাজারে যখন ভোজ্যতেলের বুকিং দর কমছে, তখন বাংলাদেশে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৭ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পাম অয়েলের দাম লিটারপ্রতি কমেছে ১৪ টাকা। ৯ জুন সরকারের সঙ্গে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈঠকে নতুন এ দাম ঠিক করা হয়। এর আগে সর্বশেষ গত ৫ মে ভোজ্যতেলের দাম বেঁধে দিয়েছিল সরকার। ১৫ দিন পরপর দাম পুনর্নির্ধারণের কথা থাকলেও এবার সেটি হয়নি। ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরাও বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে ভোজ্যতেলের বাজারদর ১৫ দিন পর নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। যদিও ব্যবসায়ীদের এ দাবিকে ভোক্তাদের স্বার্থবিরোধী বলে মনে করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ বকসী বণিক বার্তাকে বলেন, ঘন ঘন ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় করা হলে ভোক্তাদের লোকসানই হবে। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, কাস্টমসসহ একাধিক সরকারি সংস্থার তথ্য নিয়ে পর্যালোচনার মাধ্যমে ভোজ্যতেলের মিলগেট, ডিলার, পাইকারি ও খুচরা দাম নির্ধারণ করা হয়। সম্প্রতি ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় করে পাম অয়েলের দাম কমানো হয়েছে। এভাবে বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও ধারাবাহিকভাবে দাম সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হওয়ার কারণে সরকার চাইলেই পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে না। এর পরও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হওয়ার কারণে ট্যারিফ কমিশনের মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানিকারকদের সঙ্গে বসে দাম নির্ধারণে সুপারিশ করে। আমদানি ক্রয়মূল্য, পরিবহন খরচ, শুল্ককর, পরিশোধন খরচসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সরকারি একাধিক সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের আবেদনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। এ কারণে এক মাস পর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক ও পর্যালোচনা করতে সময় কিছুটা বেশি ব্যয় হচ্ছে। এতে ভোক্তারাই বেশি লাভবান হচ্ছে বলে মনে করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভোজ্যতেল পাইকারি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম টানা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এখন দাম ধীরে ধীরে কমতির দিকে রয়েছে। এ কারণে ১৫ দিন পরপর দাম নির্ধারণ করা হলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা লাভবান হবেন। আমরা এরই মধ্যে সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছি। আশা করছি, সরকার বিষয়টি নিয়ে আগামীতে সঠিক সিদ্ধান্তই নেবে।

প্রসঙ্গত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৯ জুন ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে মিল মালিকদের উদ্দেশে। এর মধ্যে এক লিটার খোলা সয়াবিনের দাম মিলগেটে ১৮০ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ১৮২ ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে ১৮৫ টাকা। এছাড়া এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন মিলগেটে ১৯৫ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ১৯৯ ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য করা হয় ২০৫ টাকা। এক লিটারের খোলা পাম অয়েলের (সুপার) দাম মিলগেটে ১৫৩ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ১৫৫ ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য করা হয়েছে ১৫৮ টাকা। এক্ষেত্রে সয়াবিনের দাম খোলা ও বোতলজাতের মধ্যে লিটারপ্রতি দাম ৫-৭ টাকা বাড়ে এবং পাম অয়েলের দাম কমানো হয়েছে লিটারপ্রতি ১৪ টাকা।

তবে দেশের বাজারে পাম অয়েলের দাম কমানো হলেও পাইকারি বাজারে এর তেমন একটা প্রভাব পড়েনি। বরং পাইকারিতে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) দাম ৬ হাজার ২৫০ টাকা ও খুচরায় ৬ হাজার ৭০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। এছাড়া সয়াবিনের মণপ্রতি পাইকারি দাম ৭ হাজার ২০০ টাকা ও খুচরায় ৭ হাজার ৭০০ টাকায় লেনদেন হয়েছে।