নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেই এবার রাজধানীতে বসছে ১৯টি অস্থায়ী পশুর হাট। ১৫ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ১০টি ও ১৭ জুলাই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) নয়টি হাট বসবে। এরই মধ্যে ইজারা চূড়ান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে এসব হাট বসানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। যদিও রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, প্রস্তুতি পর্বেই স্বাস্থ্যবিধির শর্ত লঙ্ঘন হচ্ছে।

ইজারাদার ও সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্যবারের মতো এবারো প্রতিটি হাটের ইজারা মূল্য ছিল গড়ে দেড় কোটি টাকার ওপরে। ইজারাদাররা আশাবাদী, শেষ সময় পর্যন্ত বেচাকেনা করতে পারলে ইজারার টাকা উঠে আসবে। তবে করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের কারণে মাঝপথেই হাট বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ইজারাদার ও গরুর ব্যাপারীরা।

গতকাল ডিএসসিসির পোস্তগোলা শ্মশানঘাট অস্থায়ী পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, শেষ সময়ের প্রস্তুতি চলছে। একদিকে চলছে বাঁশ গাড়ার কাজ। অন্যদিকে ছিড়িয়ে-ছিটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে মানুষ। বেশির ভাগেরই মুখে নেই মাস্ক। শারীরিক দূরত্ব মানার তো বালাই নেই। অন্যদিকে ধূপখোলা মাঠে গিয়ে দেখা গেল, ১৫ জুলাই হাট শুরুর কথা থাকলেও কার্যত চলতি সপ্তাহের শুরুতেই হাটে বিক্রির জন্য গরু নেয়া হয়েছে। কেবল ঝিনাইদহ থেকেই এসেছে অন্তত ২০০ গরু। গরু ব্যাপারী মোসলেম উদ্দিন বলেন, তাদের এলাকায় পানি উঠেছে। সে কারণে একটু আগেভাগেই পশু নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন তিনি। এ সময়ের জন্য পুরো এক বছর অপেক্ষা করেছেন জানিয়ে এ ব্যবসায়ী বলেন, এখন অনেকটা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমরা ঢাকায় এসেছি।

ডিএনসিসির ভাটারা (সাঈদ নগর) অস্থায়ী পশুর হাটেও সময়ের আগেই গরু আনা হয়েছে। একই অভিযোগ ইস্টার্ন হাউজিং হাটের বিষয়েও। সাঈদনগর হাটের ইজারাদার মো. ইকবাল খন্দকার বণিক বার্তাকে বলেন, প্রায় দেড় কোটি টাকায় হাট ইজারা নিয়েছি। মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য অবশ্যই তা হবে বড় হতাশার। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন ইস্টার্ন হাটের ইজারাদার মো. কামাল হোসেন।

ডিএসসিসির গোলাপবাগ হাটের জন্য সড়কের পিচ খুঁড়ে গর্ত করে বাঁশ বসানো হচ্ছে। শ্রমিকরা মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। হাটের ইজারাদার মো. গিয়াস উদ্দিন জানালেন, হাট শেষে সড়ক ঠিক করে দেয়ার শর্তে পিচ গর্ত করার অনুমতি দিয়েছে সিটি করপোরেশন। তিনি বলেন, করপোরেশনের শর্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আমরা হাট পরিচালনা করব।

একাধিক ইজারাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তার কাছে স্বীকার করেছেন, হাটবাজারের মতো জায়গায় শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কখনই সম্ভব নয়। তবে যতটুকু সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তারা।

এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ঈদের আগেই হাট বন্ধের ভয় রয়েছে ব্যাপারী ও ইজারাদারদের মনে। তেমনই একজন ব্যাপারী তমিজউদ্দিন। তিনি বলেন, করোনা মাথায় নিয়ে আমরা এসেছি, যদি মাঝপথে হাট বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।

মাঝপথে হাট বন্ধের শঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার আমাদের যেভাবে নির্দেশ দেবে আমরা সেভাবেই তা পালন করব। সিটি কনপোরেশন থেকে ইজারাদারদের স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন মাঠে ঢোকার আগে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা, মাস্ক পরা, বারবার জীবাণুনাশক ব্যবহার করা ইত্যাদি। এসব নিয়ম পালনে ক্রেতা-বিক্রেতা সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

ডিএসসিসির ১০টি অস্থায়ী হাট হলো আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) ব্লক-ই, এফ, জি, এইচ, সেকশন ১ ও ২-এর খালি জায়গা, গোলাপবাগের দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মার্কেটের পেছনের খালি জায়গা, হাজারীবাগ এলাকার ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি মাঠ সংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন উন্মুক্ত জায়গা, উত্তর শাহজানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘের ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, দনিয়া কলেজ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, ধূপখোলা ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা এবং লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা।

ডিএনসিসির যেসব এলাকায় নয়টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানো হবে সেগুলো হচ্ছে মোহাম্মদপুরের বছিলায় ৪০ ফুট সড়ক সংলগ্ন রাজধানী হাউজিং, স্বপ্নধারা হাউজিং ও বছিলা গার্ডেন সিটির খালি জায়গা, উত্তরখান মৈনারটেক শহীদনগর হাউজিং (আবাসিক) প্রকল্পের খালি জায়গা, বাড্ডা ইস্টার্ন, ভাটারা (সাইদনগর) অস্থায়ী পশুর হাট, সেকশন-৩-এর খালি জায়গা, হাউজিং (আফতাব নগর) ব্লক-ই, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বাচল ব্রিজ সংলগ্ন মস্তুল ডুমনী বাজারমুখী রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গা, কাওলা শিয়ালডাঙ্গা সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তরখান মৈনারটেক শহীদনগর হাউজিং (আবাসিক) প্রকল্পের খালি জায়গা, উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় অবস্থিত বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে বিজিএমইএ পর্যন্ত খালি জায়গা ও ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন ৩০০ ফুট সড়ক সংলগ্ন উত্তর পাশের সালাম স্টিল লিমিটেড ও যমুনা হাউজিং কোম্পানি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন খালি জায়গা।

এ ১৯টি অস্থায়ী হাট ছাড়াও ডিএনসিসি এলাকায় গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট ও ডিএসসিসির সারুলিয়া স্থায়ী পশুর হাটেও কোরবানির পশু বেচাকেনা চলবে। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে ডিএসসিসি তিনটি হাটের ইজারা বাতিল করেছে এবং ডিএনসিসি নির্ধারিত হাটের মধ্যে দুটি হাট কম বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।