বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর ৩ এপ্রিল বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পক্ষ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে পোশাক খাতের কারখানাগুলোর কটন (তুলট) সুতা আমদানিতে এলসি খোলার সুযোগ রহিত করে নীতিমালা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।
দেশে সুতা আমদানির প্রধানতম উৎস ভারত। বিটিএমএ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে আমদানীকৃত তুলট সুতার তিন-চতুর্থাংশই আসে ভারত থেকে। চীন-পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ থেকে কিছু পরিমাণে আমদানি হলেও তা একেবারেই সামান্য। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে কয়েকজন সুতা আমদানিকারক অনানুষ্ঠানিক মন্তব্যে বণিক বার্তাকে বলেছেন, বিটিএমএর চিঠিতে সরাসরি দেশটির নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু এ সুতার প্রায় ৭৫ শতাংশ যেহেতু ভারত থেকে আসছে, সেহেতু তারা প্রকারান্তরে সেখান থেকেই আমদানি বন্ধের দাবি তুলেছেন।
দেশে সুতা উৎপাদন সক্ষমতা ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছেন টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা। সামনের দিনগুলোয়ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে এ ধারা অব্যাহত রাখবেন বলে তারা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন। দেশের পোশাক কারখানায় আমদানীকৃত সুতা ব্যবহারের বিষয়টিকে এ বিনিয়োগ লাভজনক করে তোলার পথে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখছেন তারা।
আমদানীকৃত সুতার সঙ্গে মূল্য নিয়ে প্রতিযোগিতায় এরই মধ্যে বেশ বিপাকে পড়েছেন দেশী স্পিনাররা। এমনই এক সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং মিলের তথ্য পাওয়া যায়; যেখানে বিক্রি করতে না পারায় সুতার মজুদ জমেছে প্রায় ৬৫ লাখ পাউন্ড। প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা মূল্যের এ সুতা বাজারে ছাড়তে পারছেন না কারখানাটির উদ্যোক্তা। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তুলনামূলক কম দামে আমদানি করা সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না কারখানাটি।
যদিও দেশের বাজারকেই সম্ভাবনাময় বিবেচনায় সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছেন টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা। সামনের দিনগুলোয়ও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। আগামী বছরের মধ্যে শুধু সুতা উৎপাদনেই খাতটি নতুন ৪০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিনিয়োগের দেখা পেতে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ টেক্সটাইল টুডের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আবার খাতটির উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিটিএমএর হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছর শেষ হওয়ার আগেই খাতটির সুতা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে যাচ্ছে ৩৫ লাখ বেল (প্রতি বেল = ৪৮০ পাউন্ড বা প্রায় ২১৮ কেজি)।
বিটিএমএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৫১০। এ মিলগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৬০ কোটি কেজি বা দেড় কোটি বেল। এ পরিমাণ সুতা দেশের রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণে সক্ষম। তার পরও রফতানিমুখী পোশাক শিল্প-কারখানাগুলো প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তুলট সুতা আমদানি করে থাকে, যার সিংহভাগেরই জোগানদাতা ভারত।
স্পিনিং মিল মালিকরা এখন এ আমদানির বিপক্ষেই শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। গভর্নরকে দেয়া বিটিএমএর চিঠিতে বলা হয়, দেশী স্পিনিং মিলগুলোয় দীর্ঘদিন ধরেই রফতানি মানের কার্ডেড ও কম্বড কটন সুতার বিপুল পরিমাণ মজুদ রয়েছে। রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প এখন বন্ডেড ওয়্যারহাউজের মাধ্যমে ডলারের বিপরীতে বিপুল পরিমাণে কার্ডেড ও কম্বড সুতা আমদানি করছে। পোশাক উৎপাদনে দেশী সুতা ব্যবহারে মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু অ্যাডিশন হয় ৫৫-৬০ শতাংশ। পক্ষান্তরে আমদানীকৃত সুতা দিয়ে পোশাক উৎপাদন করলে ভ্যালু অ্যাডিশন হয় ৩০ শতাংশ।
এতে আরো বলা হয়, তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানাগুলোকে অন্তর্বর্তীকালের জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো থেকে অন্ততপক্ষে ৭০ শতাংশ কটন সুতা ক্রয়ের নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এটি বর্তমান ডলার সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে সুতার মজুদের কারণে মিলগুলোয় যে তারল্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণেও সহায়ক হবে।
বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ কটন সুতা উৎপাদনে শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ অবস্থায় জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় কটন সুতা আমদানিতে এলসি বন্ধ করার নির্দেশনা বা নীতিমালা জারির অনুরোধ জানানো হচ্ছে। প্রস্তাব আমলে নেয়া হলে তা আগামী ঈদুল ফিতরের সময় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-বোনাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি পরিশোধে মিলগুলোর সংকট দূর করায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এতে একদিকে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের সরবরাহ চেইনে ভারসাম্য তৈরি হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রাও সংরক্ষণ হবে।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ আলী খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই আমরা গভর্নর বরাবর চিঠিটি পাঠিয়েছি।’
কিন্তু তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আবার সুতা আমদানি বন্ধের বিপক্ষে। তাদের ভাষ্যমতে, স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহের পরিবর্তে সুতা আমদানিতে খরচ কম। দেশের স্পিনারদের কাছ থেকে সুতা সংগ্রহ করতে গেলে তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। অথচ পোশাক খাতের আমদানিকারক ক্রেতারাও এখন পণ্যের মূল্য বাড়াতে একেবারেই নারাজ।
জানতে চাইলে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পোশাক রফতানিকারকরা কটন সুতা আমদানি করে থাকে। আমদানি যা হয়, মূলত ভারত থেকে করা হয়। এ সুতা আমদানি বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়া হলে সেটা ঠিক হবে না। কারণ এতে করে স্থানীয় মিল মালিকরা একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ নিতে শুরু করবেন। বিগত দিনগুলোয়ও দেখা গেছে কেজিপ্রতি আড়াই ডলারের সুতা ৫ ডলার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না থাকায় আমাদের বিপাকে পড়তে হয়েছে। কারণ ক্রেতারা আমাদেরকে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘স্থানীয় মিলগুলোর সুতার দাম যদি ভারতীয় সুতার মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। দেখা গেছে ভারতীয় সুতার মূল্য সব সময়ই স্থানীয় মিলগুলোর চেয়ে কম। ফলে কোনোভাবেই আমদানি রহিত করা যাবে না। করলেই স্থানীয় মিলগুলো ইচ্ছামতো সুতার মূল্য বাড়াবে। দেখা যাবে সকালে এক দাম তো বিকালে আরেক দাম। আর মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বের যে প্রান্তেই সুতা কম মূল্যে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই আমরা কিনব। ক্রেতানির্ভর আমাদের পোশাক শিল্পের ক্রয় কৌশলই হলো সস্তা ও দ্রুত সরবরাহ। দেশে বর্তমানে কটন সুতার ৬০ শতাংশের মতো স্থানীয় মিলগুলো থেকে কেনা হয়। আর ৪০ শতাংশের মতো আমদানি হয়। এ সুতা আমদানি যা হয়, তা মূলত ভারত থেকেই হয়। অন্য কোনো দেশ থেকে আমরা আনি না।’
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের মোট সুতা আমদানির ৭৪ শতাংশই এসেছে ভারত থেকে। চীন থেকে এসেছে ১২ শতাংশ। পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া থেকে এসেছে যথাক্রমে ৭ ও ৫ শতাংশ। তুরস্ক থেকে আমদানি হয়েছে ১ শতাংশ। বাকি ১ শতাংশ আমদানি হয়েছে অন্যান্য দেশ থেকে।
গত বছর দেশে ২৮৪ কোটি ৬৭ লাখ ডলার মূল্যের কটন সুতা আমদানি হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২০৬ কোটি ৩২ লাখ ডলারের ।










