বৈশ্বিক করোনা মহামারীর প্রভাবে রফতানি বন্ধ থাকায় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমায়  দিনাজপুর জেলায় কমেছে সুগন্ধি ধানের আবাদ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় সুগন্ধি ধানের আবাদ হয়েছে ৮৫ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমিতে। যেখানে গত বছর জেলায় সুগন্ধি ধানের আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৬২১ হেক্টর জমিতে।

উত্তরের জেলাগুলোর মধ্যে দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি কাটারিভোগ ও সুগন্ধি ধান চাষ হয়। আবার জেলার অঞ্চলভিত্তিক উপজেলাগুলোতে সুগন্ধি চালের অন্যান্য জাতও রয়েছে। জাতগুলোর মধ্যে চিনিগুঁড়া, কালোজিরা, কাটারিভোগ, বাদশাভোগ, রাঁধুনী পাগল অন্যতম। দিনাজপুর সদর উপজেলার খাঁনপুর, কাঁউগা, করিমুল্লাপুর, চিরিরবন্দর উপজেলার মুকুন্দপুর, ভিয়াইল, ছোট বাউল, বড় বাউল, তালপুকুর, দুর্গাডাঙ্গা এবং কাহারোল উপজেলায় সুগন্ধি ধান চাষাবাদ হয় সবচেয়ে বেশি। চলতি মৌসুমে সুগন্ধি ধান আবাদ কম হলেও ফলন হয়েছে বাম্পার। এই মৌসুমে উৎপাদিত ধানের প্রায় ১০ শতাংশ সুগন্ধি জাতের ধান। দিনাজপুর জেলার মাটি ও আবহাওয়া কারণে এ অঞ্চলে কাটারিভোগের ফলন বেশি হয়।  

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ জানান, আমন মৌসুমে দিনাজপুর জেলায় সুগন্ধি ধানের চাষ হয় ব্যাপকভাবে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বিদেশেও সুগন্ধি চালের রফতানি শুরু হওয়ায় গত ১০ বছরে সুগন্ধি ধানের আবাদ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে জেলায় ৪১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে সুগন্ধি ধানের আবাদ হয়েছে। তখন ফলন হয়েছিল ৮৭ হাজার টন সুগন্ধি চাল। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মৌসুমে জেলায় সুগন্ধি ধানের আবাদ হয়েছে ৮৫ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমিতে। আর সুগন্ধি চালের উৎপাদন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন। 

সুগন্ধি ধানের আবাদ কমে যাওয়া প্রসঙ্গে উপপরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ জানান, দেশে সুগন্ধি চাল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় উৎসবে অতিথি আপ্যায়নে। লোকসমাগমে সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরে সুগন্ধি চালের চাহিদা কমেছে ব্যাপক হারে। করোনা মহামারীর কারণে বিদেশে সুগন্ধি চাল রফতানি বন্ধ থাকায় এর প্রভাবও পড়েছে উৎপাদনে।

দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি সুজা-উর-রব চৌধুরী বণিক বার্তাকে জানান, জেলার চাল ব্যাবসায়ীরা গত বছর চিকন চালে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েন। স্কয়ার, প্রাণ, ইস্পাহানিসহ চিকন চালের বড় ক্রেতারা তেমন একটা চাল কেনেনি। ফলে বাজারে জোগানের তুলনায় চাহিদা কম ছিল। অনেক ব্যবসায়ী লোকসানে চাল বিক্রি করলেও কারো কারো কাছে এখনো রয়েছে গত বছরের চিকন চাল।

দিনাজপুরের পুলহাট এলাকার চিকন চাল ব্যাবসায়ী মো. আমিন জানান, গত বছর ১ হাজার ২০০ মণ চাল রেখেছিলাম ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে। মৌসুম শেষে সেই চাল বিক্রি করেছি ২ হাজার ৯০০ টাকায়। লাভ তো দূরের কথা বরং মণপ্রতি লোকসান হয়েছে ৩০০ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ, গুদাম ভাড়া ও ব্যাংকের সুদ যোগ করলে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে।

দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার আব্দুলপুর এলাকার কৃষক মো. আনোয়ার হোসেন জানান, গত বছর সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে কালোজিরা ধান চাষ করেছিলাম। উৎপাদনও ভালো হলেছিল। কিন্তু বাজারে চিকন ধানের চেয়ে মোটা ধানের চাহিদা ছিল বেশি। চলতি আমন মৌসুমে তাই পরিবারের খাওয়ার জন্য দুই বিঘা জমিতে চিকন ধান লাগিয়েছি। বাকি জমিতে মোটা ধান আবাদ করেছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) খালেদুর রহমান জানান, সুগন্ধি ধান দিনাজপুরের একটি ঐতিহ্য। এরই মধ্যে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এ ধান। ফলে দিনাজপুরের কাটারিভোগ এখন বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। সুগন্ধি ধানের আবাদ বাড়াতে কৃষি বিভাগ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কৃষি বিভাগ সবসময় কৃষকদের পাশে থেকে মাঠ দিবস, কৃষক সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ ও ভিডিও প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছে।