অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে তাপমাত্রার পরিবর্তন, পলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ও দখল-দূষণসহ নানা কারণে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকির পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য। মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার প্রভাব পড়ছে হাওরের মাছের প্রাপ্যতায়। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য বলছে, ২০০৮ সালে যেখানে ৬৩ প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতা ছিল ৮৩ শতাংশের মতো, সেখানে ২০১৮ সালে তা কমে ৫১ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে এ হাওরে মাছের প্রাপ্যতা কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি।
ডিকলাইন ইন ফিশ স্পেসিস ডাইভারসিটি ডিউ টু ক্লাইমেট অ্যান্ড অ্যানথ্রোপোজেনিক ফ্যাক্টরস ইন হাকালুকি হাওর, অ্যান ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল ওয়েটল্যান্ড ইন নর্থওয়েস্ট বাংলাদেশ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হাকালুকি হাওরের জলাভূমিতে পাওয়া মাছের বৈচিত্র্যের পরিবর্তনগুলো মূল্যায়ন করেছেন। মূলত হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশগতভাবে নাজুক অবস্থায় থাকা এ হাওরে মাছের প্রাপ্যতা ক্রমেই কমছে।
গবেষকদের একজন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ২০০৮ সালে এ হাওরের ৬৩ প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতা ছিল ৮৩ শতাংশের কাছাকাছি। সেটি ২০১৮ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে। সেই হিসেবে আমাদের গবেষণায় গত ১০ বছরে এ হাওরে মাছের প্রাপ্যতা ৩০ শতাংশের মতো কমার তথ্য মিলেছে। মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণও আমাদের গবেষণায় উঠে এসেছে। সেসবের মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রার পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়া বা কমা ও হাওর এলাকার জলাভূমিতে পলি জমে যাওয়া। মাছের বংশ বিস্তারে তাপমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে মাছের ডিম ছাড়ার সময়। ফলে কোনো একটির তারতম্য হলেও মাছের বংশ বিস্তারে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। হাওর এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ দিনে দিনে কমছে। এছাড়া প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে মাছ ধরতে কারেন্ট জালের ব্যবহার, অতিরিক্ত মাছ আহরণ ও মাছ চাষে ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহারের কারণও উঠে এসেছে এ গবেষণায়।
হাকালুকি হাওরের ৮০ শতাংশই মৌলভীবাজারে। বাকি ২০ শতাংশের অবস্থান সিলেটে। বাংলাদেশের প্রধান চারটি মাদার ফিশারিজ এলাকার অন্যতম এটি। বিভিন্ন আকারের ২৭৬টি আন্তঃসংযুক্ত বিল নিয়ে গড়ে উঠেছে হাওরটি। এছাড়া বিভিন্ন ছড়া ও খাল মিলিয়ে হাওরসংশ্লিষ্ট জলাধারের মোট সংখ্যা প্রায় ৩০০টি।
স্থানীয়রা জানান, হাকালুকি হাওর এলাকায় জলাভূমি ভরাট হয়ে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে মাছের বিচরণস্থল। মৌলভীবাজার অংশে পলি পড়ে খাল-বিলগুলো ক্রমেই ভরাট হচ্ছে। হাওরসংশ্লিষ্ট অনেক ছড়া, খাল-বিল এরই মধ্যে অস্তিত্ব হারিয়েছে। আবার হাওর ইজারায় মাছ চাষের প্রথাও চালু রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যারা ইজারা নেন তারা হাওরের বাস্তুসংস্থান নিয়ে তেমন সচেতন নন। অন্যদিকে মাছ ধরাও চলে নির্বিচারে। যার প্রভাবে হাওরে আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না।
হাকালুকি হাওরের বিশাল জলরাশির মূল প্রবাহ হলো ১০টি ছোট-বড় নদী। এ জলরাশি হাওরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কুশিয়ারা নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। প্রতি বছর উজানের পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে প্রচুর পলি এসব নদী দিয়ে হাওরে প্রবেশ করছে। নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় এসব পলি বিলগুলোকে ভরাট করে দিচ্ছে। অন্যদিকে নদী শীর্ণ হয়ে পরিণত হচ্ছে খালে।
প্রতি বছর বর্ষাকালে হাকালুকি হাওরসংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে বিশাল রূপ ধারণ করে। বর্ষায় পানির গভীরতা হয় দুই থেকে ছয় মিটার। এক সময় হাওরে ছোট-বড় ২৩৮টি বিল ছিল। এসব বিলের মধ্যে সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে হারিয়ে গেছে ২১টি। বর্তমানে কোনো রকম অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে ২১৭টি বিল। অধিকাংশ বিলই আংশিক ভরাট হয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এসব খাল ও বিলের বড় অংশই ভরাট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানি কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এসব বিলে মাছের উৎপাদনও কমে গেছে।
এ বিষয়ে মত্স্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক উৎসের বিভিন্ন জলাধারে মাছের প্রাপ্যতা কমছে। হাকালুকি হাওরও এর বাইরে নয়। ক্রমাগত বিলের আয়তন কমছে আবার নির্বিচারে মাছ শিকার করতে বিভিন্ন ধরনের জালের ব্যবহার হচ্ছে। যার ফলে মাছের বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে। মানবসৃষ্ট পরিস্থিতির পাশাপাশি প্রাকৃতিক কারণে এসব হাওরে মাছের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এর বাইরেও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) এক জরিপে উঠে আসে যে সঠিক পরিকল্পনার অভাব, খাল-বিল-ছড়া ভরাট ও দখলের কারণে হাকালুকির জীববৈচিত্র্যও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত দুই দশকে এ হাওরে পাখির বিচরণ ৪৫ শতাংশ কমার তথ্যও দেয় এ জরিপটি।
ওই গবেষণায় বলা হয়, দূষণ-দখলে হাওরের বাস্তুসংস্থান এখন অনেকটাই বিপন্ন হয়ে উঠেছে। হাকালুকি হাওরে ১৫০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছের মধ্যে বর্তমানে ১১২টি টিকে আছে। ১২০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও সরীসৃপ বিলুপ্তপ্রায়। প্রতি বছর শীতকালে হাওরে প্রচুর বিরল প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আসত। কিন্তু বিচরণস্থল কমে যাওয়ার পাশাপাশি চোরাশিকারির দৌরাত্ম্যে সে পাখির বিচরণও এখন খুব কম। আবার জলাধার ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় হাওরের জমিতে এখন শস্য আবাদ হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।










