টেকনাফ নয়াপাড়ার বাসিন্দা নূরী বেগম। প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমালে দুই কন্যা সন্তান নিয়ে আশ্রয় নেন নিকটস্থ একটি আশ্রয় কেন্দ্রে। সেখানে নারী ও শিশুদের সঙ্গে ছিল পুরুষরাও। টানা ৩৬ ঘণ্টা ওই আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানের সময় তিনি নানা ধরনের কটূক্তি ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। দুর্যোগকালীন এমন ঘটনাগুলো শুধু নূরী বেগমের সঙ্গেই নয়, হয়েছে উপকূলের ৭৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারী ও শিশুর সঙ্গে। এছাড়া ওইসব আশ্রয় কেন্দ্রে নানা ধরনের চুরির অপরাধেও নারী ও শিশুদের দায়ী করে নির্যাতন করার তথ্য উঠে এসেছে উপকূলীয় অপরাধ নিয়ে করা পুলিশের এক গবেষণায়।
এ ধরনের অপরাধ উপকূলবাসীর নিরাপদ জীবন ব্যবস্থার পাশাপাশি সমুদ্রসম্পদনির্ভর অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগকালীন ঘটে চলা অপরাধ ও ভুক্তভোগীদের তথ্য সংগ্রহে একটি গবেষণা করে পুলিশ। গত বছরের আগস্টে করা ওই গবেষণায় অংশ নেন উপকূলের ৩৮৫ জন বাসিন্দা। তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা গবেষণায় উঠে এসেছে উপকূলীয় নানা অপরাধের তথ্যও। গবেষণায় দেখা যায়, প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, জোয়ার, অতিবৃষ্টি ও বন্যাসহ নানা দুর্যোগকালীন উপকূলের বাসিন্দাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫১ দশমিক ২৩ শতাংশ অপরাধের শিকার হন নারীরা। এরপর ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ অপরাধের শিকার হন শিশুরা। অপরাধের শিকার প্রবীণদের সংখ্যা ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তবে উপকূলে দুর্যোগকালীন সবচেয়ে কম অপরাধের শিকার হন পুরুষরা। তাদের সংখ্যা ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।
উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগকালীন পুলিশের দেখা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষণায় অংশ নেয়াদের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর ওইসময়ে যারা পুলিশের দেখা পেয়েছেন তাদের ৪৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ মনে করেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে পুলিশ।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী, দেশের ৩৩ উপজেলাকে সাগরসংলগ্ন বিপৎসংকুল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে সরকার। এসব উপজেলায় পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম না হওয়ায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ঘূর্ণিদুর্গত এলাকাগুলোয় এখনো নির্মিত হয়নি পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার। যেগুলো রয়েছে সেগুলোও পুরোপুরি সংস্কার করা হয়নি। পুলিশের গবেষণার তথ্যও বলছে এ ধরনের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় নারী ও শিশুদের অবস্থানের জন্য পৃথক কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দুর্যোগকালীন তারা বেশি অপরাধের শিকার হচ্ছেন।
উপকূলীয় অঞ্চলের অপরাধ নিয়ে গবেষণাটি করেছেন পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালক (গবেষণা ও প্রকাশনা) মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্যোগকালীন উপকূলীয় অঞ্চলে অপরাধের প্রবণতা অনেক বেশি বেড়ে যায়। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এসব অপরাধের ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন। দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ তৈরি হলে উপকূলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে তাদের যেসব আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয় সেগুলোয় আলাদা কোনো পার্টিশন নেই। মানে নারী, শিশু ও পুরুষ একসঙ্গে থাকার ফলে সেখানেও এক ধরনের অপরাধের শিকার হন নারী ও শিশুরা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতন ও কটূক্তির মতো অপরাধ বেশি ঘটে।’
দুর্যোগকালীন উপকূলের নারী ও শিশুদের নিরাপদ রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশের কথা তুলে ধরেন মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বলেন, ‘দুর্যোগকালীন উপকূলের নারী ও শিশুদের নিরাপদ রাখতে হলে প্রথমেই আমাদের আশ্রয় কেন্দ্রগুলো নারী, শিশু ও পুরুষদের জন্য আলাদা করতে হবে। একেবারে সম্ভব না হলে অন্তত নারী ও শিশুদের ফ্লোরগুলো পৃথক করতে হবে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে নারী ও শিশুদের জন্য সোশ্যাল এডুকেশন সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে উপকূলে ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার করতে হবে। যাতে নারী ও শিশুরা যেকোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হলেই অভিযোগ করতে পারে। সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে দুর্যোগকালীন উপকূলে নারী ও শিশুদের নিরাপদ রাখা যাবে।’










