চাহিদার তুলনায় সরবরাহ না বাড়ায় দেশে গ্যাস সংকট ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। আগামী দুই বছরে এ সংকট আরো বাড়বে বলে মনে করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এজন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ বাড়াতে মাতারবাড়ীর পাশাপাশি পটুয়াখালীর পায়রায় ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) ও সামিট পাওয়ারকে পায়রাতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এদিকে পায়রায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হওয়ায় সেখানে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগ্রহ জানিয়ে আবেদন করেছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল)।

পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বিদ্যুৎ, জ্বালানির বিশেষ সরবরাহ আইনে টার্মিনাল নির্মাণে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হলেই খুব দ্রুত এ কাজ শুরু করা হবে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

দেশে বর্তমানে ১০০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার দুটি এলএনজিভিত্তিক টার্মিনাল রয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে টার্মিনাল দুটি পরিচালনা করছে সামিট পাওয়ার ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেটেড এনার্জি। পায়রাতে ভাসমান টার্মিনাল দুটি নির্মাণ করা গেলে দেশে এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ২০০ কোটি ঘনফুট।

গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের মেগা প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোই দেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। পটুয়াখালী, খুলনাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। কক্সবাজার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করবে পেট্রোবাংলা। কিন্তু দূরত্ব বিবেচনায় এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করতে অনেকটাই চ্যালেঞ্জ। পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি শিল্প-কলকারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় সবচেয়ে বড় কোম্পানি এনডব্লিউপিজিসিএল। বর্তমানে সংস্থাটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ৬৩ মেগাওয়াট। পায়রাতে সংস্থাটির তিনটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মোট ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র আমদানীকৃত এলএনজি দিয়ে চালানো হবে। একই সঙ্গে সংস্থাটি খুলনা অঞ্চলে ৮০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। চলতি বছর এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এটিও জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস নিয়ে পরিচালনা করা হবে। ফলে এ অঞ্চলে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে সংস্থাটির কাছ থেকে বড় ধরনের ব্যবসা পাবে পেট্রোবাংলা।

এনডব্লিউপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী এএম খোরশেদুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, পায়রায় ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এলএনজি বিদ্যুিভত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি নিশ্চিত করা যাবে। কক্সবাজার থেকে গ্যাস নিয়ে এসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা অনেক চ্যালেঞ্জ। সেই বিবেচনায় পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্যাস সংকট কেটে যাবে।

অন্যদিকে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য পেট্রোবাংলার কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল সামিট পাওয়ার। দেশীয় গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে পায়রাতে ৫০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার এ প্রস্তাব দেয় বলে জানা যায়। তবে পেট্রোবাংলা পায়রাতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে এখনো কোনো দরপত্র আহ্বান করেনি।

তবে নাম প্রকাশ না করার সত্ত্বে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, পটুয়াখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য এনডব্লিউপিজিসিএল ও সামিট পাওয়ারকে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ হাব হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে সেটি বন্দর থেকে অর্ধশতাধিক কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করা হবে। নাব্যতা সংকটে সাগরে এ ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে এ গ্যাস যুক্ত করা হবে। তারপর সেটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি খুলনা অঞ্চলে এ গ্যাস সরবরাহ করা হবে।

পায়রায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হওয়ায় নতুন করে সেখানে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনা করছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল)। পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা বিবেচনায় সরকার যে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে, তার মধ্যে এপিএসসিএলের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রয়েছে। পায়রায় এলএনজিভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সেখানে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে সংস্থাটি।

আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী এএমএম সাজ্জাদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, পায়রায় যে জায়গাটিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, সেখানে এখন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু হবে। প্রকল্প এলাকায় বর্তমানে মাটি ভরাটের কাজ চলছে। তবে এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে এখনো কারো সঙ্গে চুক্তি হয়নি।

এপিএসসিএল সূত্রে জানা গেছে, পায়রায় কয়লাভিত্তিক তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলেও প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে আরেক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের জুনে সরকার ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করলে এপিএসসিএলের বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৯২৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে সংস্থাটি। ভূমিতে থাকা ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করে এপিএসসিএল। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি বাতিল হলেও সেখানে মাটি ভরাটের কাজ করছে এপিএসসিএল।

দেশে বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ সক্ষমতা ২২০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৭০ কোটি ঘনফুট রয়েছে এলএনজি। গ্যাস সরবরাহ সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র-শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে আবাসিকে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে রেশনিং করতে হয় পেট্রোবাংলাকে।