চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও এর আওতাধীন ওভারফ্লো ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক এ অপারেটর ১৫ বছর টার্মিনালটির পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে। আর সেই খসড়া কনসেশন চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটির গতকালের বৈঠকে। এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা হয়েছে এনসিটি। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দাখিল করা প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো ইয়ার্ড (ওসিওয়াই)-এর পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) এ চুক্তি সম্পাদন করবে। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে শুরু হওয়া দেশের বহুল আলোচিত এনসিটি পরিচালনার উদ্যোগটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছবে।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত আরএফপির আর্থিক শর্ত অনুযায়ী অপারেটরের সঙ্গে প্রতি টিইইউ নির্দিষ্ট রেভিনিউ-ভিত্তিক প্রস্তাব দেয়ার কথা বলা হয়। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত ট্যারিফ স্ল্যাবে রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলকে।

এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এর আগে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের ক্ষেত্রেও পিপিপি প্রকল্পে প্রতি টিইইউতে নির্দিষ্ট রাজস্ব বা ফিক্সড রেভিনিউ মডেল বিবেচনা করা হয়েছে। এনসিটির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সমীক্ষা ও লেনদেন কাঠামো তৈরির প্রতিবেদনে প্রতি টিইইউতে নির্দিষ্ট রাজস্ব দেয়ার মডেল সুপারিশ করা হয়েছিল। এমনকি এনসিটির জন্য অনুমোদিত দরপত্রেও প্রতি টিইইউতে নির্দিষ্ট রাজস্ব দেয়ার শর্ত রাখা হয়েছিল।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদেশে দেশে টার্মিনাল পরিচালনাকারী বিদেশী অপারেটরদের জন্য শতভাগ কর অব্যাহতির সুযোগ রাখা হয়েছে। এর আওতায় বিদেশী কারিগরি কর্মীদের আয়, রয়্যালটি, কারিগরি জ্ঞান ব্যবহারের ফি ও লভ্যাংশও করমুক্ত রাখা হয়েছে।

এনসিটি বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালনা করছে। বিদেশী অপারেটর নিয়োগের পক্ষে চবকের যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে টার্মিনালের দক্ষতা বাড়ানো এবং জাহাজ ও কনটেইনারের অবস্থানকাল কমানো।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ও মুখপাত্র সৈয়দ রেফায়েত হামিম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা আরো কীভাবে বাড়ানো যায় সরকার এটা নিয়ে সচেষ্ট। এনসিটি পরিচালনার বিষয়েও চবক সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ীই এগোচ্ছে।’ তিনি এর বেশি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের কনটেইনার পণ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই পরিবহন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বন্দরে বর্তমানে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পরিচালনা করছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। অন্যদিকে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও এনসিটি এখনো দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় টার্মিনাল এনসিটি প্রায় এক বছর ধরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালনা করছে।

জার্মান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের হিসাব অনুযায়ী, এনসিটির বার্ষিক সক্ষমতা ধরা হয়েছিল ১১ লাখ একক কনটেইনার। তবে সক্ষমতার সে হিসাবকে ছাড়িয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টার্মিনালটিতে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানামা করেছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে পরিচালিত মোট কনটেইনারের প্রায় ৪০ শতাংশই এককভাবে এনসিটির মাধ্যমে হয়েছে। একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজ ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ রয়েছে টার্মিনালটিতে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে মূলত জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার নামানো এবং রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে তোলার কাজ হয় এখানে।

চট্টগ্রাম বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনসিটিতে বিদেশী অপারেটর যুক্ত হওয়ার পর কতটা বিনিয়োগ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি-বেসরকারি অংশীদার মডেলে কমপক্ষে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আগে এ অংক ছিল ২ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে তা কমিয়ে আনা হয়েছে। দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি এখন সময়ের দাবি। তবে মূল বিষয় হলো, দেশের স্বার্থ ঠিক রেখে সেটি করা হচ্ছে কিনা। দরকষাকষিতে আমরা আসলে কোন অবস্থানে আছি।’