নগরীর শতাধিক হাসপাতালের সংক্রামক বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সুলতান করপোরেশন’। প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নেই। এমনকি নিয়ম না মেনে খোলা পরিবেশে চিকিৎসা বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ সক্ষমতার ইনসিনারেটর, পানি শোধনের জন্য ইটিপি, জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা ও বিশেষায়িত অবকাঠামোর ঘাটতি নিয়েই চলছে পুরো কার্যক্রম। প্রতিদিন যে পরিমাণ মেডিকেল বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তার তুলনায় চসিকের ব্যবহৃত পুরনো ইনসিনারেটরের (উচ্চ তাপমাত্রার চুল্লি) সক্ষমতা অনেক কম। ফলে একদিকে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে কিছু বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রামক চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
চিকিৎসা বর্জ্য বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, বিভিন্ন মেডিকেল বর্জ্যকে ১১টি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এ বর্জ্য পরিশোধন কিংবা বিনষ্টকরণে ইনসিনারেটর ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা আছে। অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী, হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল বর্জ্য শোধনাগার রাখার নিয়ম আছে। বর্জ্য ফেলার আগে তা প্রথমে অটোক্লেভস বা ইটিপির মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করার কথাও বলা আছে এ আইনে। যদিও চট্টগ্রামে মেডিকেল বর্জ্য ধ্বংসে এসব নিয়মের অধিকাংশই মানা হচ্ছে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মাহফুজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে যে মেডিকেল বর্জ্য পরিশোধন করা হয়, তাতে ব্যাকটেরিয়া থেকে যায়। যারা এ বর্জ্য সংগ্রহ করে ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত তারাও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছেন। যেখানে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে, সেখানে ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক। বিশেষত বর্জ্য পোড়ানোর পর সেগুলোর ছাই ঠিকঠাকমতো নষ্ট করা হচ্ছে কিনা সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। নয়তো স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়বে।’
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বর্জ্য অপসারণ ও ধ্বংসে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ইনসিনারেটর স্থাপনের বিধান রয়েছে। তবে কোনো হাসপাতালেই এ ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসা বর্জ্য বাইরে অপসারণ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেরও (চসিক) মেডিকেল বর্জ্য পরিশোধনের পূর্ণাঙ্গ নিজস্ব কোনো স্থাপনা নেই। এ কারণে চুক্তিভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ ও ধ্বংস করা হচ্ছে। যদিও নগরীর আনন্দপুর এলাকায় জাপানের জাইকার অর্থায়নে চসিককে একটি ইনসিনারেটর দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে অর্থের বিনিময়ে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে তা ধ্বংস করছে। চসিকের তথ্যমতে, নগরীর হাসপাতালগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই-চার টন মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয়। অথচ ইনসিনারেটরটির বর্জ্য পরিশোধন সক্ষমতা মাত্র এক টন।
মেডিকেল বর্জ্য খুবই ভয়াবহ, সঠিকভাবে ধ্বংস করা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে হসপিটাল ওয়াশ ম্যানেজমেন্ট বা মডার্ন ওয়াশ ম্যানেজমেন্ট প্লান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নিচ্ছি। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হলে চমেকের মেডিকেল বর্জ্য দূষণ কয়েক গুণ কমে আসবে।’

চট্টগ্রাম নগরীর শতাধিক হাসপাতালের বর্জ্য ধ্বংসে মানা হচ্ছে না পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক বিধি
ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, আগে ‘সেবা সংস্থা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ ও ধ্বংসের কাজ পরিচালিত হতো। ২০২৫ সালে দরপত্রের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুলতান করপোরেশনকে (নগর সেবা) হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ ও ধ্বংসের দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করে চসিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎস থেকেই বর্জ্য পৃথক্করণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি হাসপাতালের জন্য ছয় ধরনের পৃথক বিন থাকার কথা। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ বর্জ্য, চিকিৎসা বর্জ্য, সংক্রামক বর্জ্য, পারমাণবিক বর্জ্য, অপারেশনের পর শরীরের অংশসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যের জন্য আলাদা বিন। তবে দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে চার ধরনের বিন ব্যবহার করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, হাসপাতাল থেকে পৃথক করা বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে নিয়ে ধ্বংস করতে হয়। এজন্য বর্জ্য বাছাইয়ের শেড, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বা অন্যান্য উপকরণ ছোট টুকরো করার জন্য শ্রেডিং ব্যবস্থা, জীবাণুমুক্তকরণ ইউনিট, পানি পরিশোধনে ইটিপি ও উচ্চ তাপমাত্রার ইনসিনারেটর থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২ হাজার ২০০ ডিগ্রি তাপমাত্রার বেশি হলে বর্জ্য সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয় এবং ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন কমে আসে। এর কম তাপমাত্রায় বর্জ্য পোড়ানো হলে সেটি থেকে বেশি ধোঁয়ার সৃষ্টি হতে পারে এবং পরিবেশের ক্ষতি বেশি হয়। এছাড়া অপারেশনের সময় কেটে ফেলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, ভ্রূণ বা শরীরের অংশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য নির্ধারিত পিটে মাটিচাপা দেয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হয়। এসব পিট দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি পুরো স্থাপনায় জীবাণুনাশক বেসিন ও বর্জ্য পরিশোধনের জন্য কার্যকর ইটিপি থাকাও বাধ্যতামূলক।
এত নিয়ম থাকলেও চট্টগ্রামে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ শর্তই মানা হচ্ছে না। নগরীর হালিশহরের আনন্দবাজার ময়লার ডিপোতে জাইকার অর্থায়নে স্থাপিত পুরনো ইনসিনারেটরে মেডিকেল বর্জ্য পুড়িয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণে বিভিন্ন ঘাটতির প্রমাণ পেয়েছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে যে পদ্ধতিতে বর্জ্য ধ্বংস করা হচ্ছে সেটি আধুনিক নয়। শুকনো ও প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। যেগুলো পোড়ানো সম্ভব না, সেগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মেডিকেল বর্জ্য যেভাবে অপসারণ করা হয় চট্টগ্রামে সেটা করতে অনেক সময় লাগবে। শুরুর দিকে সব বর্জ্য তারা পুড়িয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করত। পরে আমরা সরজমিনে গিয়ে বিষয়টি শনাক্ত করে ভেজা ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেলার নির্দেশনা দিয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যে ইনসিনারেটর আছে তার পরিশোধন ক্ষমতা মাত্র এক টন। কিন্তু নগরী থেকে গড়ে প্রতিদিন দুই-তিন টন বা আরো বেশি মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। ফলে ধারণ ক্ষমতায় দুই বা তিন গুণ বর্জ্য ধ্বংস করতে গিয়ে নানা সমস্যা হচ্ছে। তবে মেডিকেল বর্জ্য ধ্বংস বা অপসারণ নিয়ে মেয়র খুব সিরিয়াস। বেশি ধারণক্ষমতার ইনসিনারেটর স্থাপনের জন্য জাইকা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা চলছে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ এবং পরিবহনে চুক্তি হওয়া প্রতিষ্ঠানের বিশেষ যানবাহন থাকার কথা থাকলেও সেটি নেই। তাছাড়া আনন্দপুরে যখন কয়েক মাস আগে বর্জ্য ধ্বংসের স্থান পরিদর্শন করা হয়, তখন সেখানে সিটি করপোরেশনের একটি শেড পাওয়া গেছে। একটি ইনসিনারেটরও আছে। তবে মেডিকেল বর্জ্য পৃথক করে ধ্বংসের যে নিয়ম আছে, সেটিও মানা হচ্ছে না। এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের যে ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়, সেটিরও আবেদন করেনি তারা।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মহানগর) মুক্তাদির হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেডিকেল বর্জ্য সঠিক নিয়ম না মেনে ধ্বংস করা বা মাটিতে পুঁতে ফেলা না হলে সেটি মানবজীবন ও পরিবেশের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ বা ধ্বংসে বিভিন্ন অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল থাকার কথা থাকলেও সেগুলোর ঘাটতি রয়েছে। যারা বর্জ্য ধ্বংসের কাজ করছে, তারা ছাড়পত্রের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদনও করেনি। অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আইনত অবৈধ। আর চসিকের ইনসিনারেটর অনেক পুরনো মডেলের। এ চুল্লি দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য ধ্বংস কতটা সম্ভব হয়, সেটিও ভেবে দেখা দরকার।’
সব নিয়ম মেনে মেডিকেল বর্জ্য ধ্বংস করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে মেসার্স সুলতান করপোরেশন (নগর সেবা) কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি জিয়া উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই ধ্বংস করা হচ্ছে। ছাড়পত্রের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরেও আবেদন করা হয়েছে। অধিদপ্তরের শর্ত মেনে আমরা কাজ করছি।’










