নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাকে কোনো অবস্থাতেই ওই পদে পুনর্নিয়োগের সুযোগ নেই। যদিও রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেনের চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ার পরও বিধিবহির্ভূতভাবে তাকে অধ্যক্ষ পদে পুনরায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধান শিক্ষক পদে থাকাকালীনও অবৈধভাবে বছরের পর বছর অধ্যক্ষ হিসেবে সিল ব্যবহার করতেন তিনি।

মো. ফরহাদ হোসেনের অনিয়ম তদন্তে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করে সম্প্রতি প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটিতে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মাউশির উপপরিচালক (শারীরিক শিক্ষা) মো. আক্তারুজ্জামান ভূঞা, সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ক্রয়) মো. তানভীর মোশারফ খান, সহকারী পরিচালক (বিশেষ) মো. খালেদ সাইফুল্লাহ ও সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক) কাউছার আহমেদ।

ফরহাদ হোসেনের অধ্যক্ষ পদে পুনরায় নিয়োগ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ অনুযায়ী, ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রধান, সহকারী প্রধান কিংবা শিক্ষক-কর্মচারীকে কোনো অবস্থাতেই পুনরায় নিয়োগ কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যাবে না। ফরহাদ হোসেনের জন্মতারিখ ১৯৬০ সালের ৩ জুলাই। সে হিসেবে ২০২০ সালে ২ জুলাই ৬০ পূর্তিতে তিনি অবসরে যান। যদিও গত বছরের ২০ মে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য তার নিয়োগের মেয়াদ বাড়ায় গভর্নিং বডি, যা বিধিসম্মত হয়নি।

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শনে যাই। সেখানে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীর লিখিত ও মৌখিত বক্তব্য গ্রহণ করি। সবার বক্তব্য ও তথ্য-প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন।

এছাড়া প্রধান শিক্ষক পদে থাকাকালীন বছরের পর বছর নিজেকে অধ্যক্ষ দাবি করে ওই পদের সিল ব্যবহার করতেন ফরহাদ হোসেন। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও ফরহাদ হোসেন বিধিমোতাবেক অধ্যক্ষ পদটি ব্যবহার করতে পারেন না। যদিও ২০১০ সাল থেকেই তিনি অধ্যক্ষ সিল ব্যবহার করে আসছেন, যা গুরুতর অনিয়ম বলেই মনে হয়েছে। কেননা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো অনুযায়ী স্ববেতনে প্রধান শিক্ষক হিসেবেই নিয়োজিত থাকার কথা। এক্ষেত্রেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে প্রতীয়মান হয়।

এদিকে প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমপিও শিটে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে ফরহাদ হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিধিসম্মত নয়। তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তি পর্যন্ত ২০ লাখ টাকার বেশি অর্থ উত্তোলন করেছেন। এ বিষয়টি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।

ফরহাদ হোসেনকে বাদ দিয়ে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগের সুপারিশও করা হয়েছে মাউশির তদন্ত প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে সরকারি নীতিমালা মেনে একজন নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।

সার্বিক বিষয়ে মাউশির উপপরিচালক (শারীরিক শিক্ষা) মো. আক্তারুজ্জামান ভূঞা বলেন, কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আসা অভিযোগ তদন্তে আমাদের কমিটি করা হয়েছিল। কমিটির পক্ষ থেকে কাজ করতে গিয়ে আমরা বেশকিছু অনিয়ম খুঁজে পেয়েছি। মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র ও বিবিবিধানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিষয়গুলো উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। মূলত যে বিষয়টি উঠে এসেছে সেটি হচ্ছে, ফরহাদ হোসেনের অধ্যক্ষ হিসেবে দেয়া নিয়োগটি বিধি অনুসরণ করে হয়নি। এজন্য আমরা নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।