সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গঠিত টাস্কফোর্সের সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ১১ সচিব। আরো আছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিএমপি কমিশনার, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী। বিআরটিএ ও বিআরটিসির চেয়ারম্যান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ এ টাস্কফোর্সের সদস্য সংখ্যা ৩১। গঠনের ১১ মাস হয়ে গেলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো কাজ করেনি এ ‘শক্তিশালী’ টাস্কফোর্স। কমেনি সড়ক-মহাসড়কের বিশৃঙ্খলা।
দেশের সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে দেয় জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল। ১৫ সদস্যের ওই কমিটি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য ১১১টি সুপারিশসংবলিত একটি প্রতিবেদন কাউন্সিলে জমা দেয়। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সভাপতি করে ৩৩ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে গত বছরের ১৫ অক্টোবর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে টাস্কফোর্সের কার্যপরিধিও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এতে সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদারকরণ এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় টাস্কফোর্সকে।
শাজাহান খানের কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল শহরে জেব্রা ক্রসিং নির্মাণ। রাজধানীতে এ সময়ে নতুন জেব্রা ক্রসিং তো হয়ইনি, উল্টো আগের যেসব জেব্রা ক্রসিং ছিল, সেগুলোও রঙ উঠে হারিয়ে গেছে। গতকাল সরেজমিন রামপুরা-কুড়িল বিশ্বরোড মহাসড়ক ঘুরে বিদ্যমান জেব্রা ক্রসিংগুলোর দৈন্যদশা চোখে পড়ে। দাগ উঠে গিয়ে এসব জেব্রা ক্রসিং বলতে গেলে হারিয়েই গেছে। জেব্রা ক্রসিং থাকা পয়েন্টগুলোতে ঝুঁকি নিয়ে পার হতে দেখা গেছে পথচারীদের।
শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত করা, যেসব জায়গায় ফুটপাত নেই সেখানে ফুটপাত নির্মাণ, স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সামনে উঁচু করে জেব্রা ক্রসিং নির্মাণ এবং সড়ক বিভাজকে পথচারীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা দেয়ার মতো সহজে ও স্বল্প সময়ে বাস্তবায়ন করা যায় এমন অনেকগুলো সুপারিশ করা হয়েছিল। এর কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।
সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো স্কুলের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা, সড়ক উন্নয়নে নেয়া প্রকল্পের ৫ শতাংশ অর্থ সড়ক নিরাপত্তার জন্য রাখা, জেলা ও উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি, চালক প্রশিক্ষণে সরকারি খরচে ইনস্ট্রাক্টর তৈরির কার্যক্রম নেয়া, ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগে সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দেয়া, চাকরিতে নারী চালকদের অগ্রাধিকার দেয়া, ট্রাফিক পুলিশের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ, রাজধানী থেকে রিকশা তুলে দেয়া, রাইডশেয়ারিং কোম্পানির জন্য গাড়ির সংখ্যা বেঁধে দেয়া, কেবল লাইসেন্সধারী চালকদের মোটরসাইকেল বিক্রি করা, দৈনিক ভিত্তিতে চালক নিয়োগ না দেয়া, চালকদের সুনির্দিষ্ট মজুরি নির্ধারণ, রাস্তায় প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন, সড়কে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মতো সুপারিশও করা হয়েছিল, যেগুলোর সিংহভাগই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গঠিত টাস্কফোর্স গঠন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনের প্রায় ১১ মাস হতে চলল। অবিলম্বে কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা থাকলেও গত ১১ মাসে কোনো কাজই করেনি এ টাস্কফোর্স। গঠনের পর গত বছরের নভেম্বরে একটি সভা করেই ঝিমিয়ে পড়ে টাস্কফোর্স। বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে এ টাস্কফোর্সের সদস্য সচিব এবং সড়ক
পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (এস্টেট উইং) ইউছুব আলী মোল্লা তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে সড়ক পরিবহনে বিশৃঙ্খলা রয়ে গেছে আগের মতোই। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চলমান অবস্থায় বাসের দরজা বন্ধ রাখা, মাঝরাস্তায় যাত্রী না তোলার মতো বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। শুরুতে বাসগুলো এসব নির্দেশনা মানার চেষ্টা করলেও নজরদারির অভাবে ফের আগের অবস্থায় চলে যায় সবকিছু। পরিবহন-চালক-শ্রমিকরা যেমন ট্রাফিক আইন-কানুনের তোয়াক্কা করছেন না, তেমনি যাত্রী পথচারীও ট্রাফিক আইন মানার বিষয়ে উদাসীন। সড়কে শৃঙ্খলা আনার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও দুর্বলতা দেখছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু বিশৃঙ্খলাই নয়, চলমান নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে বাসগুলোকে যেসব স্বাস্থ্যবিধির শর্ত মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, সেগুলোও মানা হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী গণপরিবহন আগের ভাড়ায় ফিরেছে। গত দুদিনে অনেক পরিবহন শর্ত মেনে পুরনো ভাড়া আদায় করলেও কিছু পরিবহনের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যবিধি ভঙ্গসহ কিছু অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময় ঢাকা ও চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ সারা দেশে বিভাগীয় পর্যায়ে মোট ৫৩টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। শর্ত না মেনে গাড়ি চালানোয় ১৯টি মামলা এবং ৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।










