রংপুরে ধান কাটা ও মাড়াইসহ কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। প্রতি বছর কৃষিকাজে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন যন্ত্র। এসব যন্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্র। এর মধ্যে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। তিন বছর আগে কৃষিকাজে ব্যবহূত বিভিন্ন যন্ত্রের সংখ্যা ছিল ১৫৫। বর্তমানে কৃষি বিভাগের ভর্তুকিতে কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে সাড়ে চার গুণেরও বেশি। এতে কৃষকের ফসল ঘরে তুলতে খরচ যেমন কমছে, পাশাপাশি সময়ও রক্ষা পাচ্ছে। চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় শুধু ধান কাটা ও মাড়াইয়ে যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে কৃষকের ১৪ কোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় হবে বলে কৃষি বিভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভর্তুকির মাধ্যমে ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরে রংপুরে কৃষি খাতে যোগ হয়েছে মোট ৭১৭টি যন্ত্র। এর মধ্যে কম্বাইন হারভেস্টার ২১২টি, রিপার ৩৮৪ ও ট্রান্সপ্লান্টার ১২১টি। তিন বছর আগে জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় কম্বাইন হারভেস্টার ছিল ৩৫টি, রিপার ৮৫ ও ট্রান্সপ্লান্টার ছিল ৩৫টি।
জেলায় ২০২১-২২ বোরো মৌসুমে ধান আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। এবার জেলায় সম্ভাব্য শতকরা ১৪ ভাগ জমির ধান কাটা-মাড়াই কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা শুরুতে শতকরা ৫ ভাগ ছিল বলে জানা গেছে।
জেলার কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের নিচপাড়া গ্রামের কৃষক জহির রায়হান জানান, প্রতি মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের টাকা জোগাড় করতে তাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। কারণ প্রতি বছর ধান কাটা শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে। চলতি বোরো মৌসুমে তিনি ২ একর ১৬ শতক জমিতে ধান আবাদ করেছেন। ধান মাড়াই ছাড়া শুধু ২৫ শতক জমির ধান কেটে বাড়িতে বহন করে আনতে শ্রমিকরা ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করেছেন। আবার জমির প্রকারভেদ এবং জমি থেকে বাড়ির দূরত্বের ওপরও ধান কাটার মজুরি কম-বেশি হচ্ছে। স্বস্তির বিষয়, তার এলাকায় অনেকে কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবীকৃত অর্ধেক টাকা দিয়ে ধান কাটা ও মাড়াই সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু তার জমির অবস্থান অপেক্ষাকৃত নিচু হওয়ায় যন্ত্র ব্যবহার করতে পারছেন না। তার এলাকায় ৪০ দিনের কর্মসূচি চলায় বর্তমানে অধিক টাকা দিয়েও কৃষি শ্রমিক জোগাড় করতে পারেননি। উপরন্তু ঝড়-বৃষ্টির মৌসুমে তার মতো কৃষক বাধ্য হয়েছেন বেশি দামে শ্রমিক নিতে।
তিন বছর ধরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ধান ও গম কাটা-মাড়াইয়ে কম্বাইন হারভেস্টার কৃষকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সুবিধাভোগী একাধিক কৃষক বলেন, এ যন্ত্র ব্যবহারের ফলে তাদের আর্থিক সাশ্রয় যেমন হচ্ছে, তেমনি সময় অপচয়ও কম হচ্ছে। তবে কম্বাইন হারভেস্টারস্বল্পতা দূর হলে কৃষক আরো বেশি সুফল ভোগ করবেন। তারা বেশিসংখ্যক কৃষককে সহজ শর্তে সরকারি ভর্তুকিতে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন দেয়ার দাবি জানান।
মিঠাপুকুর উপজেলার কাফ্রিখাল ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের কৃষক মো. রাশেদুল ইসলাম গত আমন মৌসুমে ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে মেটাল কোম্পানির কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্র কিনেছেন। সরকারি ভর্তুকি পেয়েছেন ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। চলতি বোরো মৌসুমে তিনি জমির ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এলাকার অনেকে তার জমির ধান আগে কেটে দেয়ার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করায় এ অবস্থা হয়েছে বলে তিনি জানান। প্রতিদিন এ মেশিন দিয়ে ১৫-১৭ বিঘা জমির ধান কাটা ও মাড়াই সম্ভব। বৃষ্টির জন্য ১২ বিঘার বেশি জমির ধান কাটা-মাড়াই সম্ভব হয়নি। আবার জমিতে এক-দেড় ফুট উচ্চতায় পানি এবং ধানের গাছ হেলানো থাকায় ধান কাটা-মাড়াইয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ৫০ শতক জমির ধান কাটা-মাড়াই করতে পারিশ্রমিক নেয়া হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। একই পরিমাণ জমির ধান শ্রমিককে দিয়ে শুধু কেটে বাড়িতে আনতে পারিশ্রমিক লাগছে প্রায় ৬ হাজার টাকা।
পীরগঞ্জ উপজেলার ঘোষপুর গ্রামের কৃষক সিদ্দিক মিয়া কৃষি ভর্তুকিতে সদ্য কেনা ইয়ানমার কোম্পানির কম্বাইন হারভেস্টার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তার ভাষায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৬০০ ঘণ্টা কাজ করেছেন অথচ প্রায়ই ছোটখাটো পার্টসের ত্রুটিজনিত কারণে অচল হয়ে পড়ছে নতুন যন্ত্রটি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) অশোক কুমার রায় বলেন, সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি দেয়াসহ নানাভাবে কৃষকদের উৎসাহ দিচ্ছে। তিন বছর ধরে জেলায় কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে কৃষি শ্রমিক সংকট এবং ধান ও গম নিখুঁতভাবে কাটা ও মাড়াই হওয়ায় কৃষকদের মাঝে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এ যন্ত্র দিয়ে একদিনে প্রায় ১০ একর জমির ধান কাটা ও মাড়াই করা সম্ভব। প্রতি একরে যদি ধান কাটা ও পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত শ্রমিকরা ১২ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নেন তাহলে যন্ত্রের মাধ্যমে কাটা ও মাড়াই এবং ধান বস্তায় ভরতে খরচ হবে মাত্র ৬ হাজার টাকা। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় কৃষকের সাশ্রয় হয়েছে ১৪ কোটি টাকারও বেশি। কম্বাইন হারভেস্টারের পাশাপাশি ধান রোপণের জন্য ট্রান্সপ্লান্টার এবং শুধু কর্তনের জন্য রিপারেও আগ্রহ বেড়েছে কৃষকের।










