২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের মেয়াদের সেদিনই ছিল শেষদিন। পরদিনই নির্বাচনকালীন নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কথা। এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্ভাব্য প্রধান উপদেষ্টা নিয়ে আপত্তি ছিল তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের। এ বিতর্কে উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গন হয়ে উঠেছিল সংঘাতমুখর। এমন এক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বলা হয়েছিল লগি-বৈঠা নিয়ে ঢাকা চলে আসতে। বিদায়ী সরকারের প্রধান দল বিএনপি ও শরিক জামায়াতের মধ্যেও ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি যুদ্ধংদেহী মনোভাব।
এ অবস্থায় ২৮ অক্টোবর একই দিনে সমাবেশ করে তিন রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত। আওয়ামী লীগের সমাবেশটি ডাকা হয়েছিল পল্টন ময়দানে। বিএনপির সমাবেশের আয়োজন করা হয় নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে। আর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কাছাকাছি তিন দলের সমাবেশ সেদিন ভয়াবহ এক সংঘাতের সূচনা করে, যেটি পরবর্তী সময়ে পরিচিতি পায় ‘লগি-বৈঠা’ আন্দোলনের ঘটনা হিসেবে। এমন পরিস্থিতিতে পরদিন ২৯ অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সে সময় টানা তিনদিনের সংঘাতে মৃতের সংখ্যা নিয়ে নানা উৎসে নানা তথ্য পাওয়া গেলেও কোনোটিতেই তা ২০-এর কম উল্লেখ করা হয়নি। বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই তিনদিনের সংঘাতে দেশে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়। ওই সংঘাত সে সময় বড় এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা করে। সেবারই প্রথম তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচন আয়োজন করা যায়নি। সংঘাতমুখর ওই পরিস্থিতিই ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
১৭ বছরের ব্যবধানে আজ সে ২৮ অক্টোবরেই একই দিনে কাছাকাছি এলাকায় সমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে তিন দল। বিএনপির আজকের সমাবেশটিও আহ্বান করা হয়েছে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে। আওয়ামী লীগের সমাবেশ ডাকা হয়েছে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে। আর জামায়াত ঘোষণা দিয়েছে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার। এখন পর্যন্ত দলটি পুলিশের কাছ থেকে অনুমতি না পেলেও দলটির নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, তারা সেখানেই সমাবেশ করতে বদ্ধপরিকর।
এবারো বিতর্কের প্রধানতম ইস্যু তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তবে এবার সরকারে আছে আওয়ামী লীগ। আর বিরোধী পক্ষের ভূমিকায় বিএনপি ও জামায়াত। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ ১০ দফা দাবিতে গত বছর ১০ ডিসেম্বর থেকে রাজপথে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। চলতি বছরের ১২ জুলাই ঢাকায় বড় সমাবেশ করে সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি ঘোষণা করে দলটি। পরবর্তী সময়ে ২৮ জুলাই বড় ধরনের মহাসমাবেশ করে বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় দলটির পক্ষ থেকে আজ ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগের মতো রক্তক্ষয়ী না হলেও পরিস্থিতি আরো স্পর্শকাতর অবস্থায় চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ বিষয়ে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন ২০০৬ সালের চেয়েও নাজুক। আজকের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন অলি-গলি বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এগুলো অগণতান্ত্রিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ ও সহিংসতার উসকানি। জামায়াতে ইসলামী সমাবেশ করতে চেয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেয়া হয়নি। তারা কী করবে তা বলতে পারি না। কিন্তু এটাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে যদি কোনো সহিংসতা সৃষ্টি করা হয়, সেটি পরিস্থিতির জন্য ভালো হবে না। নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুলিশের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা যে তারা সরকারি দলের হয়ে কাজ করছেন না, তা প্রমাণ করা।’
বিএনপির আজকের মহাসমাবেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৬ সালের আজকের দিনের লগি-বৈঠার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করার হুমকি দিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আমাদের সাংবিধানিক এ আন্দোলনকে শুরু থেকেই তারা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফেরত পাওয়ার আন্দোলন করে যাচ্ছি আমরা। আজকের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগই আক্রমণের কথা বলছে। কিন্তু সমাবেশ শেষে আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বলছি আমরা। সরকারি দল যতই উসকানি দিক এবারো আমাদের লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।’
অনেকটা একই কথা বলছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যতই লগি-বৈঠার হুমকি দিক না কেন, বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আওয়ামী সরকার হয়তো মনে করতে পারে চরম উসকানি দিয়ে তারা বিএনপির কর্মীদের দিকভ্রান্ত করে নৈরাজ্যের পথে ঠেলে দেবে। কিন্তু সেটা দুরাশা মাত্র। আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করব। প্রয়োজনে সরকারের জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও বুলেট আমরা জনগণের শক্তি দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবেলা করব।’
বিশৃঙ্খলা বা আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও শান্তিপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি শান্তি সমাবেশ। যারা অশান্তি করবে, তাদের থেকে সতর্ক থাকা। আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী যার যার নির্ধারিত অবস্থানে থাকবে। তবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা আক্রান্ত হলে আমরা বসে থাকব না।’
কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে উল্লেখ করে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমরা শান্তি সমাবেশ করতে যাচ্ছি,৷ আমরা অশান্তি চাই না, বিশৃঙ্খলা চাই না, অরাজকতা চাই না। আমরা চাই দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। তবে একটি গোষ্ঠীর এ উন্নয়ন অগ্রযাত্রা সহ্য হচ্ছে না। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। আমাদের দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে, যাতে কেউ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে। পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করলে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে।’
এর আগে বিএনপির নির্ধারিত সমাবেশের দিনে জামায়াতে ইসলামীকে ঘোষণা দিয়ে রাজপথে নামতে তেমন একটা দেখা যায়নি। কিন্তু এবার একই দিনে তারাও সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে অনুমতি না পেলেও দলটির আজকের সমাবেশের ঘোষণায় পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
জামায়াতের ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে যাচ্ছে। আজকের আন্দোলনে সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারকেই সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এবারের আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলাম যুক্ত হওয়ায় বিরাজমান সংকটকে কেন্দ্র করে তারা আরো সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সরকারকে এমন একটি জায়গা তৈরি করতে হবে যাতে এ ধরনের শক্তিগুলো কোনো ধরনের সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে।’
আঞ্চলিক ভূরাজনীতি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় এবারের পরিস্থিতিকে ২০০৬ সালের চেয়েও নাজুক করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৬ থেকে ২০২৩—এ সময়টা বাংলাদেশের রাজনীতির এমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, যার মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনীতি সংঘাতবিহীন হবে। রাজনীতি আরো সংঘাতপূর্ণ হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৬ থেকে আরো বেশি স্পর্শকাতর ও নাজুক। এখন দেখার বিষয় শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি আমাদের আর কোন দিকে নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্রও এখন বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের তৎপরতায় আমরা এখন একটি চতুর্মুখী চাপের মধ্যে আছি। সামগ্রিকভাবে গোটা বাংলাদেশই বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে।’










