বর্তমান ট্যারিফ কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে তিন স্তরের ট্যারিফ চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. রিজওয়ান খান। তার মতে, এখনই এ ধরনের সংস্কার না আনলে ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নতুন সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণে উৎসাহ দিতে হবে।
বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে এসব কথা বলেন তিনি। কনক্লেভটির আয়োজন করেছে বণিক বার্তা।
ড. রিজওয়ান খান বলেন, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় দ্রুত কমছে। তাই সরকার চাইলেও এ প্রযুক্তির বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হবে না। এখনই ট্যারিফ কাঠামো এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং নেট মিটারিংয়ের ব্যবহার বাড়ে। এতে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।
তিনি বলেন, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। দেশটিতে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হলেও এর মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ এসেছে সরকারি বা আনুষ্ঠানিক খাত থেকে। বাকি অংশ এসেছে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর মানুষ নিজ উদ্যোগে বাসাবাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন শুরু করে। কারণ বিদ্যুতের খরচ বাড়লে মানুষ কম খরচের প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ড. রিজওয়ান খান বলেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুতের অংশ আরো বাড়লে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হবে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে স্পিনিং রিজার্ভ বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা আরো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, বর্তমান ট্যারিফ কাঠামোয় ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণে বিনিয়োগ লাভজনক নয়। এখন ব্যাটারি স্থাপনের খরচ প্রতি ইউনিট প্রায় ৯ টাকা। গ্রিড থেকে ব্যাটারি চার্জ করতে যে ব্যয় হয়, তা যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রতি ইউনিট প্রায় সাড়ে ২১ টাকা। অথচ পিক সময়ে বিদ্যুতের ট্যারিফ প্রায় ১৭ টাকা ৪০ পয়সা। ফলে ব্যাটারি ব্যবহারে আর্থিক উৎসাহ তৈরি হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতি বদলাতে তিনি তিন স্তরের ট্যারিফ চালুর প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত থাকবে পিক ট্যারিফ, সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অফ-পিক ট্যারিফ এবং রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সুপার অফ-পিক ট্যারিফ। এতে পিক সময়ে বিদ্যুতের দাম কিছুটা বাড়িয়ে অন্য সময়ে সমপরিমাণ কমানো যাবে। ফলে গড় ট্যারিফ অপরিবর্তিত রেখেই গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরণ পরিবর্তনে উৎসাহ দেয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ট্যারিফ চালু হলে বাসাবাড়ি, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজেল জেনারেটরের পরিবর্তে ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। তারা রাতের কম ট্যারিফের সময়ে ব্যাটারি চার্জ করে সন্ধ্যার পিক সময়ে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে। এতে জাতীয় গ্রিডে পিক লোড কমবে। পাশাপাশি সরকারকে উচ্চ ব্যয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনও করতে হবে না।
ড. রিজওয়ান খান বলেন, বর্তমানে পিক সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের প্রতি ইউনিট ব্যয় ২৩ থেকে ২৫ টাকা হলেও সেই ব্যয়ের প্রতিফলন ট্যারিফে নেই। অন্যদিকে অফ-পিক সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকে। সময়ভিত্তিক ট্যারিফ চালু হলে এ বৈষম্য কমবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার লোড কার্ভও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।
তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে ব্যক্তি ও বেসরকারি খাত নিজস্ব ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করলে জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজনের সময় সেই বিদ্যুৎ কিনতে পারবে। এতে সরকারের আলাদা বিনিয়োগ ছাড়াই জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নেট মিটারিং ব্যবস্থা আরো সহজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একজন গ্রাহক যেন অতিরিক্ত অনুমতি ছাড়াই নিজের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। একই সঙ্গে ভূমিভিত্তিক বড় প্রকল্পের তুলনায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে বেশি উৎসাহ দেয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
তার তথ্য অনুযায়ী, শিল্প প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিট খরচ সাড়ে ৫ থেকে ৬ টাকা। অন্যদিকে বড় ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্পে এ ব্যয় প্রায় ১০ টাকা।
ড. রিজওয়ান খান বলেন, সৌরবিদ্যুতের বিস্তার অনিবার্য। তাই ট্যারিফ কাঠামো, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থায় এখনই প্রয়োজনীয় সংস্কার না আনলে ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।










