ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা মূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব সরঞ্জাম দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় জব্দ হওয়ায় তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পোর্টেবল বা ভ্রাম্যমাণ এক্স-রে মেশিন চারটি, আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন চারটি, সিলিং ওটি যন্ত্রাংশ এক সেট, নেবুলাইজার মেশিন ১৮টি, স্টিল ল্যাম্প একটি, চোখ পরীক্ষার রেটিনোস্কপ মেশিন একটি, ডেন্টাল যন্ত্রাংশ এক সেট, সাকশান ইউনিট একটি।
চিকিৎসাসংক্রান্ত অত্যাধুনিক এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার জন্য অনুমতি চেয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালকের দপ্তরে একাধিকবার লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি বলে জানান সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন। ফলে ব্যবহারের অভাবে মূল্যবান এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে চলেছে।
দুর্নীতির কারণে সদর হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন মো. সজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় কিনা তা বিবেচনা করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর কয়েকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে আদালতে মামলা থাকায় এসব মালামাল ব্যবহার বা বাক্স খোলার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এ ব্যাপারে দুদকের মামলা পরিচালনাকারী দায়িত্বরত আইনজীবী মোস্তফা আসাদুজ্জামান দিলু জানান, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্ত দায়েরকৃত মামলায় নয় আসামির নামে আদালতে চার্জশিট হয়ে গেছে। বর্তমান মামলাটি খুলনার সেশন আদালতে বিচারাধীন। তবে মামলার সব আসামিই জামিনে রয়েছেন।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বিভিন্ন প্রকার চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের নামে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকার কার্যাদেশের মধ্যে ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকাই লোপাট করা হয়। বাকি প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ কেটে রাখা হয়।
জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জোগসাজশে ক্রয়কৃত মালামাল বুঝে না নিয়ে বরং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সমুদয় বিল পরিশোধ করেন তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. তহিদুল ইসলাম। বিষয়টি জানাজানি হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি টিম সাতক্ষীরা এসে তদন্ত করার পর চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে জালিয়াতি ও দুর্নীতির প্রমাণ পায়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি অনুসন্ধানে মাঠে নামে দুদক। একপর্যায়ে দুদকের অনুসন্ধানে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের নামে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকার কার্যাদেশের মধ্যে ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকাই লোপাট করার প্রমাণ মেলে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও দুদকের তদন্ত চলাকালে একপর্যায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উল্লেখিত চিকিৎসা সরঞ্জাম হাসপাতালে দেয়। তখন এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এরপর প্রায় চার বছর ধরে চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো বাক্সবন্দি।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে এ ব্যাপারে দুদকের পক্ষ থেকে মামলা হলে তদন্ত শেষে নয়জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। আসামিরা হলেন সাতক্ষীরার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমান, স্টোরকিপার একেএম ফজলুল হক, হিসাবরক্ষক আনোয়ার হোসেন, রাজধানীর ২৫/১, তোপখানা রোডের বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির কর্ণধার ঠিকাদার জাহের উদ্দিন সরকার ও তার ছেলে আহসান হাবিব, জাহের উদ্দিনের বাবা মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার আবদুস সাত্তার সরকার এবং তার ভগ্নিপতি ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশনের কর্ণধার আসাদুর রহমান, জাহের উদ্দিন সরকারের নিয়োগকৃত প্রতিনিধি কাজী আবু বকর সিদ্দিক, মহাখালী নিমিউ অ্যান্ড টিসির সহকারী প্রকৌশলী এএইচএম আবদুল কুদ্দুস। এ ব্যাপারে প্রাক্তন সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমান বলেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের শিকার।’










