দেশের উন্নয়ন সহযোগী বহুজাতিক সংগঠনগুলোর একটি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণসহায়তা দিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। সৌদি আরবের জেদ্দায় ১০-১৩ মে সংগঠনটির বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই আয়োজনে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশী পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি না মেলায় কোনো ব্যাংকের এমডিই (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) আইডিবির বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে পারেননি। এতে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে ক্ষতির শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু আইডিবির সম্মেলনে অংশ নিতে চাওয়া এমডিরাই নন, গত তিন বছরে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীই বিদেশযাত্রায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধার মুখে পড়েছেন। ২০২০ সালের ২৩ মার্চ ব্যাংক এমডিদের ঘন ঘন বিদেশযাত্রার লাগাম টানতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তাতে বলা হয়েছিল, বিদেশ ভ্রমণ আবশ্যকীয় হলে ব্যাংক এমডিদের বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হবে। ফলে প্রজ্ঞাপনটি জারির পর থেকে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা ব্যবসায়িক উদ্দেশে ও বিদেশযাত্রায় অস্বস্তির মুখে পড়েছেন।
দেশের অন্তত আটটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে এমনিতেই বিদেশযাত্রা সীমিত ছিল। অথচ ওই সময়ও বিশেষ প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হলে তা পাওয়া যায়। কিন্তু ডলার সংকটের কথা বলে গত বছর থেকে ব্যাংক এমডিদের প্রায় সব ধরনের বিদেশযাত্রায় বাধা দেয়া হচ্ছে। পারিবারিক ও পর্যটনের উদ্দেশ্য বিদেশ যাওয়া তো এক প্রকার বন্ধই রয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের পাশাপাশি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিদেশে যেতে চাইলেও অনুমোদন মিলছে না। এতে ব্যাংকের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী। যদিও অভিযোগকারী ব্যাংক নির্বাহীদের কেউ নিজের নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, পত্রিকায় নাম এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রোষানলের শিকার হতে পারেন।
বিদেশ ভ্রমণে ব্যাংক এমডিদের কতটি আবেদন এ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সেটির কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারাও এ তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। ব্যাংক নির্বাহীরা অবশ্য বলছেন, অর্ধশতাধিক আবেদন এরই মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। নিজ খরচে বিদেশযাত্রার অনুমোদনও পাওয়া যাচ্ছে না। কেবল চিকিৎসা, হজ কিংবা ওমরা পালনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যাংকের এমডি ছাড়া সব শ্রেণীর কর্মকর্তারা চাইলেই বিদেশে যেতে পারছেন। তাই এটিকে মৌলিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলেও মনে করছেন ব্যাংক এমডিদের কেউ কেউ।
জানা যায়, আইডিবির বার্ষিক সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন, প্রাইম ব্যাংকের এমডি হাসান ও রশীদ এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এমডি মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী। এর মধ্যে কামরুল ইসলাম চৌধুরী ছাড়া বাকি চারজন জেদ্দায় যেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু অনুমোদন দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকগুলোর শীর্ষ এ নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন্ত্রণ জানানো পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গেই আইডিবির ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্রেডিট লাইন রয়েছে। সম্মেলনে না যাওয়ায় সংস্থাটির সঙ্গে সম্পর্কে ঘাটতি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, কভিডের কারণে অনেক ঋণপত্র (এলসি) যথাসময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। ডলার সংকটের কারণেও এখন যথাসময়ে এলসি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিদেশী ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য হলেও বিদেশ যাওয়া দরকার। যেকোনো বৈঠকেই সশরীরে যাওয়ার একটি বাড়তি গুরুত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোয় অংশ নিলে বিশ্বের অনেক স্বনামধন্য ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন না পাওয়ায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এতে ব্যাংকের ব্যবসার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইডিবির ওই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে যেতে না পারার কারণেও অনেক দেশের আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক ও ব্যাংক এমডিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে।
দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ক্ষোভ প্রকাশ করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেকের পরিবারের সদস্যরা বিদেশে থাকেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিনিষেধের কারণে তাদের সঙ্গেও সাক্ষাতের সুযোগ হচ্ছে না। এমনকি শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে যোগ দেয়ার সময় চাকরির শর্তের মধ্যে থাকা সুযোগগুলোও উপভোগ করা যাচ্ছে না।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, কিছু ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ ঊর্ধ্বতন প্রভাবশালী কর্মকর্তারা বছরের বেশির ভাগ সময়ই বিদেশে ঘুরে বেড়ান। ওইসব কর্মকর্তার বিদেশযাত্রার লাগাম টানতেই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তবে প্রভাবশালী কিছু শীর্ষ নির্বাহীর বিদেশযাত্রা এখনো কমেনি। তারা নানা মাধ্যমে তদবির করে ঠিকই বিদেশে যাচ্ছেন।
শীর্ষ নির্বাহীদের বিদেশযাত্রায় বিধিনিষেধ আরোপ করে ২০২০ সালের মার্চে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল তাতে বলা হয়, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ নির্বাহীদের দায়দায়িত্বের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনাগুলোর সুষ্ঠু পরিপালনার্থে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার যথাসম্ভব সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে কতিপয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী দাপ্তরিক কাজে কিংবা ব্যক্তিগত ছুটিতে দীর্ঘদিনের জন্য বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকাণ্ডে সার্বিক গতিশীলতা হ্রাসের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনগত ঝুঁকিসহ আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান যতদূর সম্ভব পরিহার করার পরামর্শ দেয়া যাচ্ছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ আবশ্যকীয় হলে দেশের বাইরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেয়ার কথা উল্লেখ করেও প্রজ্ঞাপনে বেশকিছু শর্তারোপ করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. জাকির হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক নির্বাহীদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশযাত্রা কমাতে প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছিল। এতে বেশ সুফলও পাওয়া গেছে। চলমান ডলার সংকটের সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বিদেশযাত্রায় বিধিনিষেধ রয়েছে। এর পরও কোনো ব্যাংক এমডির বিদেশযাত্রার যৌক্তিকতা পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।’










