বাংলাদেশে এখন বছরে প্রায় ১০ কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়। একটা সময় পর্যন্ত দেশে চা উৎপাদনে বিদেশী কোম্পানিগুলোর আধিপত্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সে দৃশ্য পাল্টেছে। এখন দেশী কোম্পানিগুলোও সমান তালে চা উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত চায়ের ৩১ শতাংশই এসেছে একটি দেশী ও একটি বিদেশী কোম্পানির বাগান থেকে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি বাগান দিয়েই দেশের সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের রেকর্ড করেছে দ্য কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি লিমিটেড (ফিনলে)।

মূলত ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলেই এ দেশে চা শিল্পের গোড়াপত্তন। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও বিদেশী চা কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন এ শিল্পে তাদের মালিকানা ধরে রেখেছিল। পরবর্তী সমেয় দেশীয় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য বৃদ্ধি ছাড়াও কৌশলগত কারণে অধিকাংশ কোম্পানিই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে এককভাবে দেশের চা উৎপাদনে সামনে থেকে নেতৃত্বদানকারী ফিনলেও একসময় বিদেশী মালিকানার ছিল। কিন্তু এখন তা বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের হাতে।

চা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২১ সালে উৎপাদিত ৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার কেজি চায়ের মধ্যে ফিনলের সাতটি বাগান উৎপাদন করেছে ১ কোটি ৫২ লাখ কেজি, যা মোট উৎপাদনের ১৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে বিদেশী প্রতিষ্ঠান ডানকান ব্রাদার্স (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ১৬টি বাগান উৎপাদন করেছে ১ কোটি ৪৩ লাখ কেজি চা, যা মোট দেশীয় উৎপাদনের ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। সব মিলিয়ে দুটি কোম্পানির মোট উৎপাদন প্রায় ৩১ শতাংশ।

এ বিষয়ে ফিনলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) তাসিন আহমেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ফিনলে চা উৎপাদন খাতে নিজেদের সর্বোচ্চ দক্ষতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল না থেকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়। এছাড়া প্রতিনিয়ত উৎপাদন বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ দেয়া হয়। যার কারণে ভালো মানের চা উৎপাদনের পাশাপাশি প্রায় প্রতি বছরই দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণ চা উৎপাদনের তালিকায় থাকে ফিনলের বাগানগুলো।

ফিনলের সাতটি বাগানের মধ্যে পাঁচটির অবস্থান মৌলভীবাজারে, দুটির হবিগঞ্জে। এর মধ্যে ২০২১ সালের চা উৎপাদনে সবার শীর্ষে ছিল ডিনস্টোন চা বাগান। ফিনলের এ বাগান সর্বশেষ বছরে ৩৪ লাখ ৬০ হাজার ৩৫৩ কেজি চা উৎপাদন করেছে। এছাড়া ফিনলের রাজঘাট চা বাগান ৩১ লাখ ১৫ হাজার ৯১৬ কেজি, বালিশিরা চা বাগান ২১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬৭, রশিদপুর চা বাগান ১৯ লাখ ২৬ হাজার ৬৬৩, ভাড়াউড়া চা বাগান ১৬ লাখ ৯৬ হাজার ৩৩৬, দারাগাঁও চা বাগান ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮২ ও আমরাইল চা বাগান উৎপাদন করেছে ১২ লাখ ৫২ হাজার ৬৬৬ কেজি।

এছাড়া বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডানকান ব্রাদার্সের চা বাগানগুলোর ১১টি মৌলভীবাজারে ও পাঁচটি হবিগঞ্জে। বাগানগুলোর মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে আমু, চাঁদপুর, লস্করপুর, চাকলাপুঞ্জি, আলীনগর, মাঝদিহি, হিঙ্গাজিয়া, চাতলাপুর, করিমপুর, শমশেরনগর, রাজকী, লংলা, সিলোনিয়া, ইটা, নলুয়া ও পাল্লাকান্দি।

ডানকানের বাগান সংখ্যা ফিনলের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। কিন্তু সে তুলনায় ডানকানের চা উৎপাদন তুলনামূলক কম। আগে ডানকান একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের তালিকায় থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশীয় ফিনলে সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের তালিকায় রয়েছে।

এ-সংক্রান্ত চা বোর্ডের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ৩২টি বাগানের চা উৎপাদনের মোট অবদান ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ব্যক্তিমালিকানাধীন ৫০ বাগানের ১১ দশমিক ৭২, ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১২ বাগানের ৬ দশমিক ১৯, এমএম ইস্পাহানির চার বাগানের ৪ দশমিক ৬১, ডিউন্ডি টি কোম্পানির চার বাগানের ৩ দশমিক ৫৩, এম আহমেদ টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানির আট বাগানের ৩ দশমিক ২৬, ব্র্যাক টি কোম্পানির তিন বাগানের ২ দশমিক ৭২, কেদারপুর টি কোম্পানির চার বাগানের ২ দশমিক ৭১, টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের তিন বাগানের ১ দশমিক ৮৭, বাংলাদেশ চা বোর্ডের পাঁচ বাগানের ১ দশমিক ৮০, সিটি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের তিন বাগানের ১ দশমিক শূন্য ৭, হামদার্দ টি কোম্পানির তিন বাগানের দশমিক ৬৮ এবং প্যারাগন এগ্রো লিমিটেডের চারটি বাগান দশমিক ৪৬ শতাংশ চা উৎপাদন করেছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের নয়টি বাগান ১ দশমিক ৬১ শতাংশ, ক্ষুদ্রায়তনের আট হাজার চাষী ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশসহ মোট ৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে বাংলাদেশে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের চা বাগানগুলোর অধিকাংশই এখন রুগ্ণ। মুষ্টিমেয় কয়েকটি কোম্পানির হাত ধরে বাংলাদেশের চা উৎপাদন এখন ১০ কোটি কেজির কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফিনলে, ডানকানসহ প্রথম সারির কোম্পানিগুলোর মতো অন্যান্য কোম্পানিরও উচিত চা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব থাকলে দেশের চা শিল্প আরো সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

২০০৬-০৭ সালের দিকে স্কটিশ কোম্পানি জেমস ফিনলে তাদের মালিকানায় থাকা সাতটি বাগান বিক্রি করে চলে যায়। এসব বাগান কিনে নেয় পেডরোলো, ইস্পাহানি ও ফিনলে গ্রুপ। দেশীয় উদ্যোক্তাদের হাতে উৎপাদন আসার পর নিম্নমুখী খাতটিতে উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। ধারাবাহিকভাবে গত দেড় দশকে বাগানগুলো দেশের শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনের মডেল বাগানে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশীয় উদ্যোক্তারা চা উৎপাদনে মনোযোগ বাড়ালেও পিছিয়ে আছে ডানকান ব্রাদার্স। ২০০০ সালে ডানকান ব্রাদার্স চা উৎপাদন করেছিল ১ কোটি ২১ লাখ ৮৩ হাজার কেজি, যা ছিল ওই সময়ের দেশে মোট উৎপাদনের ২৩ শতাংশ। সে হিসেবে এখন তাদের উৎপাদন অনেক কমেছে। তবে এর পরও শীর্ষস্থানীয় পর্যায়েই রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিটি।