বিশ্ববাজারে কয়েক মাস ধরেই কমছে পাম অয়েলের দাম। সর্বশেষ চলতি মাসে টনপ্রতি ৮০০ ডলারে নেমে আসে অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম, যা ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের দামের প্রায় কাছাকাছি। এর মাঝের সময়টাতে ভোজ্যতেলটির দামে ব্যাপক উল্লম্ফন দেখেছে বিশ্ববাজার। দামের ক্ষেত্রে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আবারো দুই বছর আগের দামে ফিরতে শুরু করেছে পাম অয়েলের দাম।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, গত জুলাইতেই বিশ্বের খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করে, যার কারণে ভোজ্যতেলের দামে রেকর্ড পরিমাণ পতন দেখা দিয়েছে। এফএওর সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী, গত আগস্টে টানা পঞ্চম মাসের মতো খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে। সংস্থাটির ভোজ্যতেলের দামের সূচকে জুন থেকে জুলাইয়ে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে পাম অয়েলের প্রাপ্যতার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলটির দাম কমছে।
শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত পাম অয়েলের দাম ছিল টনপ্রতি ৭৯৬ ডলার। সে বছরের ডিসেম্বরে পাম অয়েলের দাম বেড়ে ১ হাজার ১৬ ডলারে উন্নীত হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পাম অয়েল লেনদেনের গড় দাম ছিল ১ হাজার ২৭০ ডলার। ২০২২ সালের মার্চে গিয়ে তা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১ হাজার ৭৭৬ ডলারে উঠে যায়। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে পাম অয়েলের টনপ্রতি দাম কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৬ ডলারে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসে তা ৮০০ ডলারে নেমে আসে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০ সালে ডিসেম্বর বাদ দিলে পুরো বছরই পাম অয়েলের দাম ৫৭৬ থেকে ৯১৭ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। অর্থাৎ ১ হাজারের ডলারের নিচেই ছিল। ডিসেম্বর থেকে তা বাড়তে শুরু করে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ৯৯০ ডলারে বিক্রি হলেও এরপর বাড়তে শুরু করে। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত দাম ১ হাজার ডলারের ওপরেই ছিল। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চ ও মে মাসে তা ১ হাজার ৭০০ ডলার ছাড়ায়। অর্থাৎ দীর্ঘ দুই বছর পর আবার পাম অয়েলের দাম আগের পর্যায়ে ফিরছে। বাজার ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনের দিনগুলোয় এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
তবে বিশ্ববাজারে অব্যাহতভাবে পাম অয়েলের দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে তা সমন্বয়ের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে খোলা ভোজ্যতেলের দামে উত্থান-পতনে অতিমুনাফা করছে কোম্পানিগুলো।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, বর্তমানে মিলগেটে প্রস্তুত পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৭০০ টাকা মণ (৪০ লিটার) দরে। এ হিসাবে প্রতি লিটারের দাম দাঁড়ায় ১১৭ টাকা ৫০ পয়সা। যদিও খোলাবাজারে একই মানের পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫-১৬০ টাকায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে খোলা পাম অয়েলের দাম ছিল ১৩০-১৩৫ টাকা লিটার। আগের বছরের শুরুতে অর্থাৎ ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দেশের বাজারে এ তেল বিক্রি হয়েছে ৮৫-৯২ টাকায়।
খাতুনগঞ্জের একাধিক ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার কারণে আমদানিকারকরা খোলা ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে অতিমুনাফা করার সুযোগ পান। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পাম অয়েলের দাম রেকর্ড পরিমাণ কমলেও দেশে সরকার নির্ধারিত দাম থাকায় কোম্পানিগুলো আগের দামেই সরবরাহ আদেশ (এসও) বিক্রি করছে। বাজার প্রতিযোগিতার কারণে চাইলেও কেউ কম দামে পণ্য বিক্রি করছে না। বাজারকে স্বাভাবিক গতিতে ছেড়ে দেয়া হলে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভোক্তারা স্বাভাবিক দামে পণ্য সংগ্রহ করতে পারত।
এ বিষয়ে নূরজাহান গ্রুপের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্ববাজারে দাম কমলেও ডলার সংকটের কারণে ভোজ্যতেলের বাজার আশানুরূপ কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ভোক্তা যাতে না ঠকে সেজন্য সরকার অতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। ট্যারিফ কমিশন যাচাই করে কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত দামের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে দেয়। এক্ষেত্রে কিছু কোম্পানি কম দামে পণ্য আমদানির সুযোগ পেলেও বাজার নির্ধারিত দামের কারণে চাইলেও কম দামে ভোজ্যতেল বিপণন করতে পারে না।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই পণ্যের দাম বাড়াতে নানা তত্পরতা শুরু করেন আমদানিকারকরা। কিন্তু এখন যখন পাম অয়েলের দাম কমছে তখন নানা অজুহাতে দাম কমাচ্ছে না কোম্পানিগুলো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে এ তেলের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া।










