গত শুক্রবার জ্বর নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হন যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রুস্তম আলী। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চারদিন পর জানা গেল তিনি করোনায় আক্রান্ত। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
হাসপাতালটিতে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে ৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন মিটফোর্ড হাসপাতালে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ২৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন।
সরেজমিন দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনায় চলছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। একই সঙ্গে করোনা-ডেঙ্গু এবং সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ রোগী, নার্স ও চিকিৎসকরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়েই মিটফোর্ড হাসপাতালের বেশ কয়েকজন নার্স ও চিকিৎসক করোনা ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসক ও নার্সরা বলছেন, ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল না হওয়ায় আমরা পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট পাচ্ছি না। এছাড়া ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়েও আমরা কাজ করছি।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাধারণ রোগীরাও। হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ড ৭ ও ৮-এ দেখা যায়, একই সঙ্গে ডেঙ্গু, কভিড ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। নবাবগঞ্জ থেকে গ্যাস্ট্রোলজির সমস্যা নিয়ে ২০ জুলাই ভর্তি হন আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। আসছে করোনা রোগীও। আমার সঙ্গে স্ত্রী ও শিশু আছে। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে ওরাও অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীদের মশারি সরবরাহ করা হলেও রোগীদের মশারি ব্যবহারের প্রবণতা কম দেখা গেছে। অনেক রোগী মশারি খাটিয়ে বাইরে বসে থাকেন। এমনই একজন লালবাগের আসলামুল হক। তিনি বলেন, সবসময় মশারির ভেতর থাকতে ভালো লাগে না। তাই মাঝেমধ্যে মশারির বাইরে বসে থাকি। নার্সরা জানিয়েছেন, একে জনবল কম, তার ওপর রোগী ও স্বজনদের অসহযোগিতামূলক আচরণ আমাদের দায়িত্ব পালনকে অনেক কঠিন করে ফেলেছে।
এদিকে এরই মধ্যে মিটফোর্ড হাসপাতালের নির্ধারিত শয্যা সংখ্যা পূরণ হয়ে গেছে। গতকাল দেখা যায়, রোগীরা হাসপাতালের মেঝেতে ও বারান্দায় যেভাবে পারছেন একটু জায়গা করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিপুল পরিমাণ রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা।
নার্স ও চিকিৎসকরা জানান, রোগীরা জ্বর-ঠাণ্ডা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের সেবা করি। কয়েকদিন পর পরীক্ষা করে দেখা যায় কভিড পজিটিভ কিংবা ডেঙ্গু। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। একাধিক নার্স বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা এখন লেজেগোবরে অবস্থা হয়ে গেছে। পূর্বে দেখেছি, ডেঙ্গুর জন্য আলাদা ওয়ার্ড করে রোগীদের সেবা দেয়া হতো। এবার রোগী বাড়ছে, কিন্তু ডেঙ্গু রোগীদের সবার সঙ্গেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। নার্সরা আরো জানিয়েছেন, কভিড রোগীও আমাদের এখানে আছে। শুধু তা-ই নয়, এমন রোগীও আছেন যার একই সঙ্গে করোনা ও ডেঙ্গু হয়েছে।
হাসপাতালটির মেডিসিন ইউনিট-১-এর সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল না হওয়া সত্ত্বেও আমরা কভিড রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আবার ডেঙ্গু রোগীদেরও চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। আমার ইউনিটের দুজন ডাক্তার এখনো করোনায় আক্রান্ত। এটা তো সুন্দর কোনো সিস্টেম হলো না। আমরা যারা চিকিৎসা দিচ্ছি, আমাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছেই, সাধারণ রোগীরাও সুস্থ হতে এসে করোনা কিংবা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।
মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদুন্নবী বণিক বার্তাকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। করোনা রোগীদেরও আমরা শনাক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকি। ঝুঁকির প্রশ্ন তুললে বলব, আমাদের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। যতটা সম্ভব কভিড সন্দেহভাজনদের আমরা একটু আলাদা রাখার চেষ্টা করি। অচিরেই আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড খোলার কথাবার্তা চলছে। শয্যা সংখ্যাও বাড়ানো হবে।










