প্রকাশ্যে আসছেন না বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়রসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর। ফলে কার্যত জনপ্রতিনিধিশূন্য হয়ে পড়েছে সিটি করপোরেশন। মেয়র খায়ের আব্দুল্লাহ বরিশাল ত্যাগ না করলেও ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর থেকেই আড়ালে রয়েছেন তারা। ওইদিন সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর বাসায় দেয়া আগুনে গাজী নঈমুল হোসেন লিটু নামে এক কাউন্সিলর মারা গেছেন। তবে বিসিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেয়র ও কাউন্সিলররা অনুপস্থিত থাকলেও সেবা কার্যক্রম ক্রমশ স্বাভাবিক হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে সিটি করপোরেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। ১৪ আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবু হেনা মোরর্শেদ জামান স্বাক্ষরিত আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের একাধিক সূত্র জানায়, কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন রয়েল নিজ এলাকায় ফিরলেও বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি এখনো ফেরেননি। মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহও প্রকাশ্যে আসছেন না। তবে তিনি বরিশাল নগরীতেই অবস্থান করছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

বিসিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তার জন্য মেয়র প্রকাশ্যে আসছেন না। ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আর কার্যালয়ে আসেননি। অফিস না করলেও সবার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে জনসেবা নিরবচ্ছিন্ন করে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মেয়র। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জুলাই মাসের বেতন ১৪ আগস্ট পরিশোধ করা হয়েছে। মেয়র বরিশালেই আছেন এবং নগর ভবন সচল রাখতে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখছেন।

বরিশাল সিটি করপোরেশনে ৪০টি ওয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড। সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলররা এলাকায় থাকলেও ২০-২২ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রকাশ্যে আসছেন না।

১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুহমুদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সাদিক আব্দুল্লাহর বাসায় দেয়া আগুনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর গাজী নঈমুল হোসেন লিটু মারা গেছেন। তিনি না থাকায় আমরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কবে নাগাদ আবার নির্বাচন ও কাউন্সিলর পাব তা অনিশ্চিত।’

সংরক্ষিত ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ডালিয়া পারভীন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অনেকেই এলাকায় নেই। বিভিন্ন কারণেই তারা এলাকায় ফিরছেন না। এতে নারী কাউন্সিলরদের ওপর কাজের চাপ বেড়েছে। আমার কার্যালয় নিয়মিত খুলছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগেই থাকছে। পুরুষ কাউন্সিলররা এলাকায় ফিরলে কাজের চাপ কমে আসবে।’

৪ আগস্ট সন্ধ্যায় পুড়িয়ে দেয়া হয় ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন রয়েল এবং ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মেহেদী পারভেজের কার্যালয়। আগুনে জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সার্টিফিকেট, প্রত্যয়নপত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়ে যায়। ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে প্রকাশ্যে আসছেন না তারা দুজন।

আনোয়ার হোসেন রয়েল বলেন, ‘ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের গুরুত্বপূর্ণ কাগজ কার্যালয়ে রাখা ছিল। সবকিছুই পুড়ে গেছে। অনেক নথি ছিল আমার ল্যাপটপে। তাও নিয়ে গেছে। আমার হয়তো কার্যালয়, আসবাবপত্র পুড়েছে। কিন্তু মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। জন্মনিবন্ধনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পুড়ে যাওয়ায় এগুলো পুনরায় সংগ্রহ করা কষ্টসাধ্য। বাড়ি থেকে কাজ করার চেষ্টা করছি। কার্যালয় না থাকায় কেউ কেউ বাসায় আসেন। তখন তাদের কাজ করে দিচ্ছি।’

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শাওন বলেন, ‘কাউন্সিলর কেফায়েত হোসেন রনি মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সরকার পতনের পর রনি পালিয়ে গেছেন। শিগগরিই যে তিনি এলাকায় ফিরতে পারবেন, তা বলা যাচ্ছে না। তার কার্যালয়ে আমাদের বেশকিছু কাগজ আটকে রয়েছে।’

২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, ‘আমি নিয়মিত অফিস করছি। আমার ওয়ার্ডে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নাগরিক সেবা যথানিয়মে চালু রয়েছে। নগর ভবনে প্রথম দু-একদিন একটু সমস্যা হয়েছিল, তবে এখন সবই স্বাভাবিক। মূলত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এখন নগর ভবনের তত্ত্বাবধান করছেন।’

এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেল বলেন, ‘নগর ভবনে সব সেবাই স্বাভাবিক গতিতে চলছে। আশা করছি ওয়ার্ড পর্যায়েও দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে।’