কয়েক দিন আগে টাঙ্গাইলে নিজের বাড়িতে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন আহমদ আলি। বর্তমানে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাসায় হঠাৎ তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল, শরীরের এক পাশে অবশের অনুভূতি হচ্ছিল। কেউই প্রথমে বুঝে উঠতে পারেননি কী সমস্যা হয়েছে। তবে তারা রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসক জানান তিনি স্ট্রোক করেছেন। এরপর তাকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। এভাবে কেটে যায় অনেকটা সময় আর সে কারণে বেড়ে গেছে রোগীর শারীরিক জটিলতা ও জীবনের ঝুঁকি।

এমন অভিজ্ঞতা দেশের অনেক স্ট্রোক রোগী ও তাদের স্বজনের। লক্ষণ শনাক্ত করতে না পারা, হাসপাতালে নিতে দেরি হলে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায় না। চিকিৎসকরা বলেন, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে। সেই হাসপাতালে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই এবং প্রয়োজনীয় স্ট্রোক চিকিৎসার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা নিতে হবে। কখন লক্ষণ দেখা যাওয়া শুরু হয়েছে, সেটি মনে রাখা জরুরি। কারণ স্ট্রোকের ধরন নির্ণয়ে দ্রুত পরীক্ষা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করার ক্ষেত্রে সময় গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবস আজ। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্যে স্ট্রোক-পরবর্তী প্রতিটি মিনিটকে মূল্যবান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে হৃদরোগের পরই স্ট্রোকের অবস্থান। লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং জরুরি চিকিৎসা নিতে মানুষকে সচেতন করতে এ বছর বিশ্বজুড়ে প্রচারণায় ‘অ্যাক্টফাস্ট’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে চিকিৎসা পেতে যত দেরি হয়, মস্তিষ্কের তত বেশি কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক (নিউরোলজি) ডা. এটিএম হাসিবুল হাসান (পরাগ) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্ট্রোক হওয়ার পর সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে স্ট্রোকজনিত প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। চিকিৎসকদের মধ্যেও আরো বেশি সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।’

স্ট্রোকের সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবার ঘাটতি কথা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা শহরে মাত্র পাঁচ-ছয়টি হাসপাতালে স্ট্রোকের সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এর মধ্যে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসে বছরে ৬০টির বেশি মেকানিক্যাল থ্রম্বেক্টমি করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের জনসংখ্যার তুলনায় সংখ্যাটি অত্যন্ত নগণ্য; রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছতে পারেন না বলেই এ জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।’

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইমার্জেন্সি মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত ‘ফ্যাক্টরস অ্যাসোসিয়েটেড উইথ লেট হসপিটাল অ্যারাইভাল ইন অ্যাকিউট স্ট্রোক পেশেন্টস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়—৪৪৮ রোগীর মাত্র ৫৫ জন, অর্থাৎ ১২ দশমিক ২৮ শতাংশ লক্ষণ দেখা দেয়ার সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছেন। গবেষণায় রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছতে পরবর্তী সময়কাল ১৪ ঘণ্টা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই রোগী বা স্বজনদের ৩ ঘণ্টা সময় লেগেছে। আর প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বিলম্ব দেখা গেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে রেফারেল বা স্থানান্তরজনিত বিলম্ব ছিল মোট সময়ক্ষেপণের বড় অংশ।

নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএস জহিরুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক একই রোগ। মনে রাখতে হবে স্ট্রোক হার্টের কোনো রোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের রোগ। স্ট্রোকের লক্ষণ চিনে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার প্রতি হাজারে ১১ জন। ২০২২ সালে নিউরোলজিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত ‘প্রিভ্যালেন্স অ্যান্ড রিস্ক ফ্যাক্টরস অব স্ট্রোক ইন বাংলাদেশ: আ নেশনওয়াইড পপুলেশন বেজড সার্ভে’ শীর্ষক গবেষণায় দেশের আট বিভাগ ও ৬৪ জেলার ২৫ হাজার ২৮৭ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সন্দেহভাজন রোগীদের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করার পর ২৮৮ জনের স্ট্রোক নিশ্চিত হয়। এ হিসাবে দেশে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব পাওয়া যায় প্রতি হাজারে ১১ দশমিক ৩৯ জনে।

বিশ্বের ২০৪টি দেশে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব, মৃত্যু ও ঝুঁকির কারণ বিশ্লেষণ করে ২০২৪ সালে দ্য ল্যানসেট নিউরোলজিতে প্রকাশিত হয় ‘গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ (জিবিডি)’ শীর্ষক গবেষণা। এতে বাংলাদেশে ২০২১ সালে ২ লাখ ২১ হাজার স্ট্রোকের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। একই গবেষণায় ওই বছর বাংলাদেশে স্ট্রোকের পর বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ ৪৯ হাজার বলে জানানো হয়।