পাবনায় বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বসতবাড়ি ও চরাঞ্চলে বেড়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। মহামারীর সময় সাপের উপদ্রব মানুষের মধ্যে আরেক আতংক সৃষ্টি করেছে। পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত দুর্লভ প্রজাতির রাসেল ভাইপারে দেখাও মিলছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবেই, গত সপ্তাহে ৩ জনসহ জেলায় এক বছর সাপের কামড়ে মারা গেছে ১৫ জন। অথচ জেলার কোনো সরকারি হাসপাতালে নেই সাপের বিষের প্রতিষেধক। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাবনার ঈশ্বরদীর পদ্মার তীরবর্তী চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন গ্রামে সাপের উপদ্রব বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঈশ্বরদীতে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র হোসেন আলী, ৫ম শ্রেণির ছাত্র আসমাল হোসেন এবং চাটমোহরে গৃহবধূ রুফিয়া খাতুন সাপের দংশনে মারা গেছেন। পাকশীর গৃহবধূ ছোফুরা খাতুনকে বিষধর সাপ দংশন করেছিল, তবে তিনি বেঁচে গেছেন। 

সাপের দংশনের শিকার রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রতিষেধক নেই পাবনার কোনো সরকারি হাসপাতালে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হলে অনেক সময় রোগী পথেই মারা যায়, বা দেরি হয়ে যাওয়ার কারণে হাসপাতালে পৌঁছালেও আর বাঁচানো সম্ভব হয় না। 

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরের জেলার ঈশ্বরদীতে পলি খাতুন, শাহজালাল ইসলাম, রাজা আলী, পাবনা সদরের আফজাল কাজী, বিএনডিসির নৈশ প্রহরী জোনাব আলী, চাটমোহরের মাদরাসা শিক্ষক শফিউল আলম, সাঁথিয়া উপজেলার হান্নান খানসহ মারা গেছে প্রায় ১৫ জন। 

এদিকে পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি এবং ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশির পদ্মার চরে রাসেল ভাইপারের দেখা মিলেছে। এক গৃহবধূকে আক্রমণ করলে এলাকাবাসী পিটিয়ে দুটি রাসেল ভাইপার সাপ মেরে ফেলেছে। 

পাবনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাজী মুহিউদ্দিন বলেন, সম্প্রতি চরাঞ্চলের এক নারীকে সাপে কামড় দেয়। এলাকাবাসী ওই সাপটি মেরে রোগী এবং মরা সাপটি সঙ্গে নিয়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে আসে। তিনদিন  চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেছেন ওই নারী। 

তিনি জানান, সাপ ঠিকমতো কামড় বসিয়ে দিতে না পারায় রোগীটি প্রাণে বেঁচে গেছেন। রোগীর সঙ্গে নিয়ে আসা মরা সাপের চেহারা, আকার ও বৈশিষ্ট্য অপরিচিত মনে হওয়ায় চিকিৎসকরা মরা সাপটি পাঠিয়ে দেন পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাবে। সেখানে বিশেষজ্ঞরা সাপটি বিলুপ্তপ্রায় তালিকায় থাকা রাসেল ভাইপার বলে শনাক্ত করেন।  

ডা. কাজী মুহিউদ্দিন বলেন, এই বিষধর সাপটি আমরা নিজেরা চিনতে পারি এবং তা দ্রুত পরিচিতি ঘটাতে সংরক্ষণ করে গবেষণার কাজে লাগানো হবে। 

বাংলাদেশ ন্যাচারাল অ্যান্ড ওয়াইল্ড কনজারভেশন কমিউনিটির সভাপতি সুপ্রতাপ চাকী বলেন, রাসেল ভাইপার অত্যন্ত বিষধর সাপ। এই সাপ কামড় দেয়ার ২ থেকে ৩ ঘন্টার মধ্যে রক্ত জমাট বেঁধে রোগী মারা যাওয়ার সম্ভবনা খুব বেশি। এই সাপের প্রতিষেধক পাওয়া বেশ দুষ্কর। 

পাবনায় সাপের উপদ্রব এলাকায় করণীয় সম্পর্কে জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত টিম গঠন করেছেন। টিমের প্রধান পাবনার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রোকসানা মিতা বলেন, চর অঞ্চলে রাসেল ভাইপার উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানে কৃষকসহ স্থানীয়দের সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গামবুটও সরবরাহ করা হয়েছে। 

পাবনার সিভিল সার্জন ডা. মেহেদী ইকবাল বলেন, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রতিষেধক থাকাটা খুবই জরুরি। সাপের প্রতিষেধক সরবরাহের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। 

পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে মিটিংয়ে বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করবো এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সাপের প্রতিষেধক কীভাবে হাসপাতালগুলোতে আনা যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হবে।