ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সুরমা নদী খনন প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়েও শেষ হয়নি। গত বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সিলেট নগরীর কুশিঘাট থেকে বিশ্বনাথের দশগ্রাম পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার খনন করা হবে এ প্রকল্পের অধীনে।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, আগামী জুন পর্যন্ত তারা খননকাজ চালিয়ে যাবে। এর মধ্যে ১৫ কিলোমিটার খনন সম্পন্ন না হলেও যতটুকু কাজ হবে তা নিয়েই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাবে। এর মধ্যে অন্তত ৮০ ভাগ কাজ শেষ করতে চায় পাউবো।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যের কারণে খননকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য নির্ধারিত সময়ে খননকাজ শেষ করা যায়নি। প্লাস্টিক ও পলিথিনের কারণে মেশিনারি যন্ত্রপাতি বিকল হয়। গত মৌসুমে ২০-২৫ মিনিট পরপর মেশিন পরিষ্কার করতে হয়েছে। তখন দফায় দফায় খননকাজ বন্ধ রাখতে হয়। অবশ্য চলতি মৌসুমে দ্রুত খননকাজ এগিয়ে চলছে বলে জানান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার আজিম উদ্দিন। তিনি জানান, বর্তমানে টুকেরবাজার ও জাঙ্গাইল এলাকায় খননকাজ চলছে।
পাউবো সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি ৫০ কোটি টাকার ব্যয়ে সিলেট নগরীর কুশিঘাট থেকে বিশ্বনাথের দশগ্রাম পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার জায়গার ১৫ কিলোমিটার খনন শুরু হয়। সিলেট সদর উপজেলার চানপুর নামক স্থান থেকে নদী খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান এমপি ড. এ কে আব্দুল মোমেন কিন্তু খনন শুরুর এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই শুরু হয় প্রতিবন্ধকতা। ২০২২ সালের জুনে শেষ হয়েছে চলমান এ প্রকল্পের মেয়াদ। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে নদীর সমীক্ষা শেষ হয়। এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে পরিমার্জন (রিভাইজ) করে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে কাজ শুরু হয়। গত বছরের বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এ বিষয়ে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলমান প্রকল্পটি আগামী জুন পর্যন্ত চালানো যাবে। এর মধ্যে শত ভাগ খননকাজ শেষ না হলেও অন্তত ৮০ শতাংশ শেষ হবে। দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। সুরমার সিলেট অংশের কুশিঘাট এলাকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে, সেটি প্রকল্পের আওতাধীন। দুই-এক মাসের মধ্যে এই অংশে খননকাজ শুরু হবে। এখানে একসঙ্গে সব ড্রেজার চালাতে হবে। এজন্য সবশেষে কুশিঘাট এলাকা খনন শুরু হবে। প্রকল্পের মেয়াদ নতুন করে আর বাড়বে না।’
সরজমিন দেখা গেছে, সিলেটের প্রধান এই নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠেছে। কাজিরবাজার, কুশিঘাটসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় এক-তৃতীয়াংশ শুকিয়ে গেছে। শুকনো স্থানে খেলাধুলার পাশাপাশি কেউ কেউ সবজিও চাষ করছেন। কোথাও কোথাও পানিও নেমে গেছে হাঁটুর নিচে। শিশুরা পায়ে হেঁটে সুরমা নদী পাড়ি দিচ্ছে যখন-তখন। তবে আবার কাজিরবাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ময়লা-আবর্জনার ছড়াছড়ি সবদিকে। এর মধ্যে পলিথিন ও প্লাস্টিক বেশি। এসব থেকে দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে।
গত ১১ বছরে সিলেটের সুরমা নদী খননে চারটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনাগুলো (ডিপিপি) মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর তিনবার সমীক্ষাও চালানো হয়। কিন্তু ওই প্রকল্পগুলোর কোনোটাই আলোর মুখ দেখেনি। ছোট পরিসরে যে একটি প্রকল্প চলছে তাও নির্ধারিত সময়ে শতভাগ শেষ করা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। খনন না করার কারণে অল্প বৃষ্টিতে বারবার জলাবদ্ধতায় পড়তে হয় সিলেট নগরবাসীকে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, খনন করে সুরমা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার। সুরমার চলমান খননকাজ জলাবদ্ধতা নিরসনে কতটুকু ভূমিকা রাখবে তা নিয়েও সংশয়ে নগরবাসী।
পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান সিলেটের কর্মী শুয়াইব হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুরমা নদীতে যে খনন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেটি গত বর্ষার আগে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা ছিল। ঠিক তাই হয়েছে। কারণ বর্ষার আগে কাজ শেষ না হলে নদীতে আবার পলি জমে আগের অবস্থায় ফিরে যায় নদীর তলদেশ। মেয়াদ বাড়লেও মাঝপথে কাজ শেষ দেখিয়ে বাজেট গলাধঃকরণ করার দুরভিসন্ধি আছে কিনা সেই সন্দেহও উড়িয়ে দেয়া যায় না।’










