কভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগীদের সেবাদানকারী চিকিৎসকদের নকল মাস্ক সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে আবারো। এবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) করোনা চিকিৎসকদের নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে সরবরাহকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নকল মাস্ক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি মামলার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ।

বিএসএমএমইউতে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া শুরু হয় ৪ জুলাই। বর্তমানে প্রতি রোটেশনে ৩৬০ জন করে চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন হাসপাতালটিতে। করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য তাদের মানসম্পন্ন সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের কথা থাকলেও নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগ তুলেছেন চিকিৎসকরা। এরই মধ্যে নকলগুলো ফেরত নিয়ে তাদের আসল এন-৯৫ মাস্ক দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতালের এক করোনা চিকিৎসক জানান, হাসপাতালের কভিড-১৯ ইউনিটের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে বলা হয়েছিল এখানকার চিকিৎসকদের ১৮৬০ সিরিজের এন-৯৫ মাস্ক দেয়া হবে। এছাড়া অন্যান্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রীও দেয়া হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রথম ব্যাচের চিকিৎসকদের দেয়া হয় ৮২১০ সিরিজের এন-৯৫ মাস্ক। প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রুপের চিকিৎসকদের মাস্ক নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। তবে তৃতীয় গ্রুপের অনেকেই নকল এন-৯৫ মাস্ক পেয়েছেন। নকল মাস্কটি আসলে স্থানীয়ভাবে বানানো মাস্ক। মাস্কের ওপর লেখা বিভিন্ন বানান ভুল। লট নাম্বারও ঠিক নেই। আসল এন-৯৫ মাস্কের সঙ্গে নকল এন-৯৫ মাস্ক ঢুকিয়ে দিয়েছে সরবরাহকারী কোম্পানি।

অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রায় ৮০-৯৫ লাখ টাকার মাস্ক নিয়েছে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ। এ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা। তাদের যোগসাজশে আসল মাস্কের সঙ্গে নকল মাস্ক মিলিয়ে সরবরাহ করেছে সরবরাহকারীরা।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিমত, যারা চিকিৎসকদের মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তারা মাস্কের গুণগত মান নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-চিকিৎসকদের কাজটির সঙ্গে যুক্ত করা যেত, কিন্তু সেটিও করা হয়নি। এটি নিঃসন্দেহে একটি অব্যবস্থাপনার নজির।

অন্যদিকে বিএসএমএমইউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নকল মাস্ক সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হবে।

বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. জুলফিকার আহমেদ আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ৪০-৪৫টি নকল মাস্কের অভিযোগ করেছিলেন চিকিসৎসকরা। আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেটি পরিবর্তন করে দিয়েছি। মাস্ক সরবরাহের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের চুক্তি বাতিল করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হবে।

শুরু থেকেই চিকিৎসকদের মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই করোনা রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছিল চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন। এ কারণেই চিকিৎসকদের মধ্যে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবও বেশি বলে জানিয়েছিল সংগঠনগুলো।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের কতজন এখন পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন, এ-সংক্রান্ত কোনো সরকারি তথ্য না পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) হিসাব বলছে, এ মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের কমপক্ষে ২ হাজার ৫৫ জন চিকিৎসক ভাইরাসটিতে সংক্রমিত হয়েছেন। একই সঙ্গে সংক্রমিত হয়েছেন আরো ৩ হাজার ৭৪৮ জন নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী। এখন পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত হয়ে ৬৮ জন চিকিৎসকের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। তাদের অনেকেই ছিলেন প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

এর আগে গত এপ্রিলে মুগদা জেনারেল হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে ‘এন-৯৫’ মাস্কের নামে যেসব মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলোর মান নিয়ে অভিযোগ করেন চিকিৎসকরা। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে গত ১৯ এপ্রিল এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, এন-৯৫ মাস্কের নামে নিম্নমানের সাধারণ মাস্ক সরবরাহের ঘটনাটিকে পরিকল্পিত প্রতারণা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করেছে মন্ত্রণালয়। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অনুসন্ধান করছে।