বরিশাল পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয় ২০০২ সালে। প্রায় সাত লাখ জনসংখ্যার এ নগরীর আয়তন ৫৮ বর্গকিলোমিটার। বাড়ি নির্মাণ করতে হলে নগর ভবন থেকে প্ল্যান অনুমোদন নিতে হয়। সিটি করপোরেশন অধ্যাদেশ ১৯৯৬-এর স্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী বাড়ির সামনে ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০ ফুট বা সরকারি ১২ ফুটের রাস্তা বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। অন্যথায় প্ল্যান অনুমোদনের সুযোগ নেই। ২০১৮ সালে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হন। তার সময়ে ছয় শতাধিক প্ল্যান অনুমোদন দেয়া হলেও মানা হয়নি স্থাপনা বিধিমালা। শুধু দলীয় ও আস্থাভাজনরা অনুমোদন পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুই বছর আগে বাড়ির নকশা তৈরি করে প্ল্যানের জন্য সিটি করপোরেশনে জমা দিয়েছেন নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জামিলুর রহমান। এরপর শুরু হয় অপেক্ষার পালা। এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। মাঝেমধ্যে নগর ভবনে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হয় তাকে। একই অবস্থা প্ল্যান অনুমোদনের জন্য আবেদন করা পরিবারগুলোর।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে নগরের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ২০১৮ সাল পর্যন্ত সবকিছুই ভালোভাবে চলে আসছিল। সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরই শুরু হয় অনিয়ম। তিনি নগর পরিষদের দায়িত্ব নেয়ার পর আটকে যায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে ভবন নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদনও রয়েছে। তার আমলে শুধু দলীয় ও তাদের আস্থাভাজনরা আবেদন করতে পেরেছে। আবেদন করলেও এক-ছয়তলা ভবনের অনুমোদন পেতে ১-৩ লাখ টাকা উৎকোচ দিতে হয়েছে। আর ৬-১০ তলা ভবনের জন্য দিতে হয়েছে ৫ লাখ টাকার বেশি।

সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সময়ে ভবন নির্মাণে প্ল্যান অনুমোদন পান ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহসিন সরদার। তিনি বলেন, ‘সাদিকের কাছের এক লোকের মাধ্যমে পাঁচতলা ভবনের প্ল্যান অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছিলাম। পরে সাদিক নিজে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘‌আপনি অনুমোদন পাবেন, তবে আমাদের নিয়ম মানতে হবে। আপনি যার মাধ্যমে এসেছেন, তার কাছ থেকে সেটা জেনে নিতে হবে। পরে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। এর দুই মাস পর প্ল্যান অনুমোদন দিয়েছে। তবে বাড়ির কাজ শুরু করার পর পড়তে হয় আরেক ঝামেলায়। শুরু হয় বিসিসির রোড ইন্সপেক্টরের হয়রানি। নির্মাণকাজে নানা ত্রুটি দেখিয়ে উৎকোচ দাবি করেন তারা।’

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে সাদিকের চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হন। তবে তিনি এক বছরের মতো দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় ৩২০টি প্লান অনুমোদন দেয়া হলেও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। ৫ আগস্ট পালিয়ে যান আবুল খায়ের আবদুল্লাহ। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আট সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. শওকত আলীকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি প্রশাসক কর্মপন্থা নির্ধারণে বৈঠক করেন। সেখানে উঠে আসে ভবন নির্মাণে প্ল্যান অনুমোদনের জন্য জমা পড়া আবেদনের বিষয়টি। সিটি করপোরেশন অধ্যাদেশ ১৯৯৬ ও ২০০৮-এর স্থাপনা বিধিমালার কোনটি তারা বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়েও আলোচনা হয়। তবে পরিষদ ১৯৯৬-এর বিধিমালা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান রোমেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে এক-ছয় তলা ভবনের প্ল্যানের জন্য আবেদন জমা রয়েছে ৬৮০টি। এছাড়া সাততলা থেকে তদূর্ধ্ব ভবনের প্ল্যান অনুমোদনে আবেদন জমা পড়েছে ৩৭টি। আবেদনের বিষয়ে ১৯৯৬-এর স্থাপনা বিধিমালা বাস্তবায়ন ও অনুমোদনে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক-ছয়তলা ভবনের প্ল্যানের জন্য গঠিত কমিটিতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ১০ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া সাততলা থেকে তদূর্ধ্ব ভবনের প্ল্যান অনুমোদনে প্রশাসকসহ ১২ সদস্য রয়েছেন। এ দুই কমিটি যাচাই-বাছাই ও সাইট ভিজিট করে প্ল্যান অনুমোদন দেবে।’