করোনাকালে ফি-বেতন আদায়ের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগ না করার নির্দেশনা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি)। যদিও এ নির্দেশনা মানছে না নর্দান ইউনিভার্সিটি। ফি-বেতন আদায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফি-বেতন জমা দিতে ব্যর্থ হলে জরিমানা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে।
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতি সেমিস্টারে তিন কিস্তিতে টিউশন ফি জমা দিতে হয় তাদের। তবে করোনায় সৃষ্ট আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা দিতে পারছেন না। এ অবস্থার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ টিউশন ফি জমা দেয়ার নির্দিষ্ট তারিখের পর শিক্ষার্থীদের আইডিতে জরিমানার টাকা যোগ করে দিচ্ছে।
এদিকে জরিমানা আদায়ের প্রতিবাদে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বন্ধ রেখেছেন। আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর দিকে আমাদের টিউশন ফির ওপর ১৫ শতাংশ ছাড় দেয়া হয়। এখনো পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সব ওয়েবার বন্ধ করে দিয়েছে। উল্টো টিউশন ফি জমা দেয়ার জন্য নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। এমনকি টিউশন ফি দিতে দেরি হলে জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। এজন্য আমরা ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছি না।
জরিমানা আরোপের বিষয়টি স্বীকার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ বিভাগের যুগ্ম পরিচালক শেখ মাহাবুর রহমান বলেন, আসলে শিক্ষার্থীদের ওপর জরিমানা আরোপ করা হলেও সেটি আদায় করা হবে না। এটি দেয়া হয়েছে মূলত তারা যেন একটু চাপে থাকে। টিউশন ফি যেন সময়মতো জমা দিয়ে দেয়।
টিউশন ফি আদায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ প্রয়োগ না করতে কয়েক দফায় নির্দেশনাসংবলিত চিঠি পাঠিয়েছে ইউজিসি। চলমান করোনা সংকটে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ২৩ নির্দেশনা দিয়েছে উচ্চশিক্ষা তদারককারী প্রতিষ্ঠানটি। ওই নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের সেশন ও টিউশন ফি আদায়ে মানবিক হওয়ার কথাও বলা আছে। নির্দেশনার চিঠিতে বলা হয়, করোনা সংকটের কারণে আর্থিক সংকটে পতিত শিক্ষার্থীদেব ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনায় রেখে সেশন, টিউশন, অন্যান্য ফি মওকুফ, হ্রাস ও ইনস্টলমেন্ট প্রদানের সুযোগ রাখতে হবে। এ সময়ে ফি আদায়ে মানসিক চাপ প্রদান সমীচীন নয়। তাই চাপ পরিহার করে শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে। এছাড়া বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগও অবারিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়। যদিও ইউজিসির এ নির্দেশনা মানছে না নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য যেখানে ওয়েবারের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে উল্টো জরিমানা আদায়ের ঘটনা খুবই দুঃখজনক ও অমানবিক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগুলোর ন্যূনতম মানবিকতাবোধ থাকলে এ ধরনের কাজ করতে পারে না। আমরা দফায় দফায় তাদের নির্দেশনা দিয়েছি। বিভিন্ন বৈঠকেও এসব বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যদি আমাদের লিখিতভাবে জানান, তাহলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ল্যাপটপ কেনা নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ চরমে: গত জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে ৬৫ শতাংশ ছাড়ে ল্যাপটপ বিক্রির ঘোষণা দিয়েছিল নর্দান ইউনিভার্সিটি। ল্যাপটপ কেনায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে ১১ হাজার ৪৯৯ টাকা জমা দিতে বলা হয়। টাকা জমা দেয়ার তারিখ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে ল্যাপটপ ডেলিভারি দেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীই ল্যাপটপ বুঝে পাননি। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ল্যাপটপের টাকা নিয়ে এখন সেটি টিউশন ফি খাতে জমা দেখাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে একজন শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের দফায় দফায় তারিখ দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত অন্তত চার-পাঁচ দফা ডেলিভারির তারিখ ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী ল্যাপটপ পাননি। শুরুতে বলেছিল, এক হাজার শিক্ষার্থী ছাড়ে ল্যাপটপ কেনার সুযোগ পাবেন। পরবর্তী সময়ে টাকা জমা নেয়ার পর সুর বদলে কর্মকর্তারা বললেন যে সিনিয়রদের দেয়া হবে না, জুনিয়রদের দেয়া হবে। অনেকের কাছ থেকে ল্যাপটপের জন্য টাকা নিয়ে সেটি এখন টিউশন ফি খাতে জমা দেখানো হচ্ছে। এটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।










