এতদিন বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এবার রেমিট্যান্সেরও প্রধান বাজার হিসেবে দেশটির নাম উঠে এসেছে। সৌদি আরবকে হটিয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের শীর্ষস্থানও এখন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে গিয়েছে। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৯৯ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। একই সময়ে সৌদি আরব থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৯৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষস্থানে উঠে এল। এতদিন যা ছিল সৌদি আরবের দখলে। মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজারও।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। একই সময়ে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ কমেছে। এ কারণে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস হিসেবে সৌদি আরব প্রবাসীরা তাদের অবস্থান হারিয়েছেন।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরবে গিয়েছেন ৫১ লাখ ৮২ হাজার ১৯৫ জন বাংলাদেশী। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ৫ লাখ ১৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশী সৌদি আরব গিয়েছেন। ২০২১ সালে দেশটিতে গিয়েছিলেন ৪ লাখ ৫৭ হাজার বাংলাদেশী। অথচ গত অর্থবছরে (২০২১-২২) মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গিয়েছিল ২১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে ২৩ শতাংশের বেশি রেমিট্যান্স কমেছে।

শ্রমবাজারের বিবেচনায় একেবারেই বিপরীত চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে। অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশীদের যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ডাইভারসিটি ভিসার (ডিবি) আওতায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী যুক্তরাষ্ট্র গেলেও এ প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ধ। বর্তমানে উচ্চশিক্ষা, পর্যটক কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশীরা যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। এরপর বিভিন্ন উপায়ে তারা সেখানে স্থায়ী হচ্ছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশটির নাগরিকত্বও নিচ্ছেন।

অন্যদিকে অভিবাসী হিসেবে সৌদি আরব যাওয়া বাংলাদেশী শ্রমিকদের সে দেশে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। শুরু থেকেই সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকরা বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতেন। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈধ হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে। এ কারণে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবক’টি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। পাশাপাশি দেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশী সাইদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থনৈতিক মন্দার আঘাত যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের ওপরও পড়েছে। এ কারণে অনেক বাংলাদেশীরই আয় কমে গেছে। আবার মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় জীবনযাপনের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। এর পরও বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের নাম শীর্ষস্থানে উঠে আসার সংবাদ শুনে আমি আনন্দিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অনেক দিক থেকেই বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১-২২ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৬৩ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকার পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রফতানি হওয়া জার্মানিতে ৪৩ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছিল। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪১ হাজার ৯৪২ কোটি এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৩ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার পণ্য রফতানি করেছিল বাংলাদেশ।

অন্যদিকে ২০২১-২২ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসে ৩৪৩ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। একই অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৪৫৪ কোটি ১৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এ তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৯৯ কোটি ৯৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। একই সময়ে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৯৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই আরেক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মাসভিত্তিক হিসেবে অক্টোবরে আবারো সৌদি আরবের নাম রেমিট্যান্স প্রবাহে শীর্ষস্থানে ফিরছে। গত মাসে সৌদি আরব থেকে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। আর একই মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।

সৌদি আরবের জেদ্দায় বসবাসকারী বাংলাদেশী ইকবাল হোসেন জানান, অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সৌদি সরকারের আইন ও রীতিনীতি দিন দিন কঠোর হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো চাইলেই এখন বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর সুযোগ নেই। টাকা পাঠাতে হলে পাসপোর্ট, আয়ের উৎসসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট জমা দিতে হচ্ছে। এ কারণে যেসব বাংলাদেশী বাড়তি আয় করছেন, সে আয় বৈধ পথে দেশে পাঠানোর উপায় থাকছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্সের অর্থ বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। আবার ডলারের দামে বড় ধরনের তারতম্যের কারণে হুন্ডিতে পাঠালে ব্যাংকের চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য অনেক বাংলাদেশী বৈধ মাধ্যমে না পাঠিয়ে হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ওমান থেকে রেমিট্যান্স কমেছে ৪১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সময়ে বাহরাইন থেকে ১১ দশমিক ৬৩, কুয়েত থেকে ৮ দশমিক ৭৭, কাতার থেকে ১ দশমিক ১৮ শতাংশ রেমিট্যান্স কমেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্য থেকেও ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ রেমিট্যান্স বেড়েছে। জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া থেকে প্রবাসী আয় বাড়লেও উল্লেখযোগ্য হারে রেমিট্যান্স কমে গেছে সিঙ্গাপুর থেকে।