ভোজ্যতেলের বাজারে এক সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল অন্তত ১০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের। ২০০৮-১০ সালের দিকে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক মন্দায় দরপতনে বড় ধরনের লোকসানে পড়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক ভোজ্যতেল আমদানি, পরিশোধন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগই বন্দরনগরী চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। লোকসানে পড়ে ব্যাংকের দায় না মিটিয়ে ঋণখেলাপির তালিকায় নাম লেখায় চট্টগ্রামের মোস্তফা গ্রুপ (মোস্তফা সয়াবিন ব্র্যান্ড), মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স (দাদা সয়াবিন), এসএ গ্রুপ (মুসকান), নূরজাহান গ্রুপ (নূরজাহান সয়াবিন), রুবাইয়া ভেজিটেবলসের (রুবাইয়া সয়াবিন) মতো এক সময়ের ভোজ্যতেলের বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো।
যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগিতার পরিবেশ হারায় ভোজ্যতেলের বাজার। দেশে ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সংগঠন থাকলেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পণ্যটির দাম নির্ধারণে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম যেমনই হোক, দেশে তা নির্ধারণ হয় মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের ভিত্তিতে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এখন দেশের বাজারে মোড়কজাত ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের রূপচাঁদা ব্র্যান্ড। অন্যদিকে খোলা ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে সিটি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপ বাজারের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
এদিকে, বোতলজাত ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার রেওয়াজ থাকলেও অবাধ প্রতিযোগিতার অভাবে মূল্যহ্রাসের সুফল পেতে বিলম্ব হয় ভোক্তাদের। অনেক সময় কোনো প্রতিষ্ঠান কম দামে পণ্য আমদানি করলেও সমিতির বাধ্যবাধকতায় যথাযথ মূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ পায় না। আবার বিশ্ববাজারে দাম কমলেও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ নিতে কোম্পানিগুলো মূল্যহ্রাসের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানসহ বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে কিংবা হঠাৎ বাজারে অস্থিরতা দেখা গেলে নির্দিষ্ট ওই পণ্য নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে পাইকারি ও খুচরা বাজার ছাড়াও পরিশোধন কারখানাগুলোয় তদারকি কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সরকারিভাবে দাম নির্দিষ্ট করে দেয়ার পর এ কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এ সুযোগে শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো মিল পর্যায়ে ভোজ্যতেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে নানা কৌশল হাতে নিয়েছে, যা এক সময় স্থিতিশীলতার দিকে যাওয়া ভোজ্যতেলের বাজার ফের অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
যোগাযোগ করা হলে বাজার মনিটরিং কার্যক্রমে থাকা সরকারের একটি সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে নাম প্রকাশ না করে বলেন, কয়েক মাস ধরে দেশের শীর্ষ ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী মিলগুলোতে অভিযান চালানো হয়েছিল। অভিযানের সময় নানা অনিয়ম পাওয়ায় এসব সংশোধনের নির্দেশনাও দেয়া হয়। অভিযান-পরবর্তী সময়ে কোম্পানিগুলো নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলেও পরবর্তী সময়ে আগের অনিয়মগুলো করে। তাছাড়া পাইকারি বাজারে অভিযানের সময় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করলেও কেউই লিখিত অভিযোগ দিতে চায় না। যার কারণে আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলে মনে করছেন তিনি।
ভোজ্যতেলের আমদানি, পরিশোধন ও মোড়কজাতের বিষয়ে কোম্পানিগুলোর দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ট্যারিফ কমিশন একটি দর নির্ধারণ করে। এর আগে কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবের দেয়া তথ্য ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে নেয়া তথ্যের বিশ্লেষণে দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের বিভিন্ন তথ্য কোম্পানিগুলো যেভাবে সরবরাহ করে, এর বাইরে যেতে পারে না ট্যারিফ কমিশন। ফলে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল পরিশোধনের সময় একাধিক গ্রেডের দাম নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয় না। অপরদিকে ভোজ্যতেল পরিশোধনের পর সর্বশেষ অবশিষ্ট বর্জ্যও সাবান তৈরির কারখানায় ভালো দামে বিক্রি করে আমদানিকারকরা। এতে কোম্পানিগুলো বড় মুনাফা করলেও দাম নির্ধারণে এসব বিবেচনায় না নেয়ায় ঠকছেন সাধারণ ভোক্তারা।
পাইকারি বাজারের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত এক মাসের ব্যবধানে ভোজ্যতেলের দাম মণপ্রতি ১ হাজার টাকারও বেশি বেড়ে গিয়েছে। যদিও বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম গত কয়েক মাসের তুলনায় সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। ব্যবসায়ীরা দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলার সংকটের বিষয়ে আপত্তি তুললেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশিতে বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারের ভোজ্যতেল। তাছাড়া মিল পর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতি, পাইকারি বাজারের ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও ডিও ব্যবসায়ীদের মজুদ প্রবণতায় ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা কোনোভাবেই দমন করা যাচ্ছে না।
জানা গিয়েছে, সরকার নির্ধারিত দামে অন্তত ১০-১৫ হাজার ভোজ্যতেলের সরবরাহ আদেশ (এসও) কিনেছিলেন ব্যবসায়ীরা। প্রায় এক মাস আগে বিক্রি হওয়া এসব এসওর বিপরীতে এসব ভোজ্যতেল মিল থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই সংগ্রহ করার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পুরনো এসব এসও দিয়ে ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এর বিপরীতে বেশি দামে সরাসরি উত্তোলনযোগ্য নতুন এসও ছেড়ে বাজার থেকে ফের টাকা তুলে নিচ্ছে পাইকারি বাজারের একাধিক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান।
খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গিয়েছে, বর্তমানে পাম অয়েল লেনদেন হচ্ছে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৫ হাজার ১০০ থেকে ৫ হাজার ৫২০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় পাইকারি বাজারে পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম অন্তত ১ হাজার টাকা বেড়ে গিয়েছে। যার কারণে আগের বিক্রি করা এসও দিয়ে এখন ভোজ্যতেল সরবরাহ দিচ্ছে না মিল মালিক কর্তৃপক্ষ। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইমার্জেন্সি ডেলিভারি নাম দিয়ে নতুন করে এসও বিক্রি করছে। পুরনো এসও দিয়ে মিল থেকে ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে এক-দেড় মাস সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে বেশি দাম দিয়ে হলেও ব্যবসায়ীরা নতুন এসও সংগ্রহ করে মিল থেকে ভোজ্যতেল কিনে নিচ্ছেন। পুরনো এসও দিয়ে ভোজ্যতেল সংগ্রহ করতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন সারা দেশের কয়েক হাজারের বেশি ব্যবসায়ী।
জানতে চাইলে মেসার্স আহাদ ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবুল বশর বণিক বার্তাকে বলেন, পুরনো এসও দিয়ে ভোজ্যতেল সরবরাহ না দেয়ার বিষয়টি ভিত্তিহীন। আমার প্রতিষ্ঠান আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসও কিনে ব্রোকারদের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। কোনো ব্যবসায়ী যদি এসও স্লিপে দেয়া তারিখে ভোজ্যতেল সংগ্রহ না করেন, এতে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের কোনো দায় নেই। অপরদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি মিল কর্তৃপক্ষ এসওর বিপরীতে ভোজ্যতেল সরবরাহ না করে, তাতেও আমার কোনো দায় নেই। বিষয়টি সম্পূর্ণ মিল কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে বলে দাবি করেছেন তিনি।










