দেশের শিল্প খাতে যে স্থবিরতা চলছে, সেটি আরো গভীর হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে শিল্প স্থাপন ও উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পণ্যের আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে। একইভাবে কমেছে এলসি নিষ্পত্তিও। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশ করা এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির পরিসংখ্যানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুলাইয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলা কমেছে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তির হারও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও শিল্প প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের এ মৌলিক উপকরণের আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছিল। শিল্পের উৎপাদনচক্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কাঁচামালের আমদানিতেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। জুলাইয়ে এ কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সময়ে কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তিও ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছরেও শিল্পের কাঁচামালের আমদানি কমেছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

ভারীর পাশাপাশি ছোটখাটো শিল্পের বিবিধ যন্ত্রপাতির আমদানিও ব্যাপক মাত্রায় কমেছে। জুলাইয়ে এ ধরনের শিল্পের এলসি খোলা কমেছে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর নিষ্পত্তির হারও কমেছে ১০ শতাংশের বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে শিল্প খাতে অনেক দিন ধরেই স্থবিরতা ও মন্থরতা চলছে। নতুন বিনিয়োগ অনেকটা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতার এ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ তীব্র জ্বালানি সংকটও। এর প্রভাবেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি উপকরণের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি এতটা কমে এসেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি এ খাতের উৎপাদনও বড় ধরনের সংকোচনের মুখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস: মান্থলি আপডেট’-এর জুলাই সংখ্যার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়কালে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক পরিবর্তন হয়ে ঋণাত্মক দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমে গেছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন প্রবৃদ্ধির পরিবর্তন ছিল ইতিবাচক ৬ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক ঋণাত্মক ধারায় নেমে যাওয়ার ঘটনাটি দেশের ইতিহাসে প্রথম।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের চিত্রও একই ধরনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির মধ্যেও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সে হিসাবে বাস্তবায়ন হয়েছে অর্ধেকের সামান্য বেশি। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে প্রায় সাত গুণ বেশি।

বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ বিরাজমান সংকটগুলোর প্রভাবেই দেশের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি কমেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ স্থবিরতা কাটিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি নিয়েছে। তবে গৃহীত কর্মসূচির সুফল মিলতে সময় লাগবে। নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিকে গতিশীল করা।’

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ঋণের চাহিদা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যা যা করণীয়, সবই করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি উচ্চ সত্ত্বেও সম্প্রতি আমরা নীতি সুদহার কমিয়েছি। এখন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বন্দর সুবিধা, যোগাযোগ অবকাঠামো—এগুলো নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বিনিয়োগ বাড়ার প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মোট ৬৯০ কোটি বা ৬ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৬ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের। জুলাইয়ে যে পরিমাণ এলসি খোলা হয়েছে, সেটি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। মূলত শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের এলসি খোলা কমলেও জুলাইয়ে জ্বালানি তেল আমদানি প্রায় ৬৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ২৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবেই জুলাইয়ে দেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি কমে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের ঘরে নেমে আসার পেছনে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে জানান শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে ১৫ হাজারের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ কিনছে, সেগুলোর বিল বকেয়া পড়েছে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে ঋণ দেয়া ব্যাংকগুলোও বিপদে আছে। আর গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের সমাধান না হলে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির আশা করা ভুল হবে।’