শীত এলেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস রূপ নেয় এক অনন্য উৎসবভূমিতে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের এ ক্যাম্পাসে শীত শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, বরং আনন্দ, মিলন আর স্মৃতির এক দীর্ঘ উৎসবের নাম। পাখি মেলা, প্রজাপতি মেলা আর শীতের পিঠার উৎসব—এ তিন আয়োজন মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাস যেন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত এক সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক মিলনমেলা। এজন্যই জাবিকে সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয়।

শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে যখন সূর্যের আলো লেকের জলে পড়ে, তখনই শুরু হয় পাখিপ্রেমীদের আনাগোনা। জাবির বিস্তৃত জলাশয়, লেকপাড় আর গাছগাছালি শীতকালে হয়ে ওঠে অতিথি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। দেশী পাখির পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথি পাখিদের দেখা মেলে এ সময়ে। পাখি মেলার পাশাপাশি প্রজাপতি মেলা যোগ করে আলাদা এক রঙিন মাত্রা। শীতের রোদে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতিরা ক্যাম্পাসকে সাজিয়ে তোলে নানা রঙে। ফুলের বাগান, ঝোপঝাড় আর খোলা মাঠে প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখতে ভিড় করেন শিক্ষার্থীরা। প্রজাপতির জীবনচক্র, পরিবেশে তাদের ভূমিকা এবং সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে মেলার আয়োজনকারীরা বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। এতে প্রকৃতির প্রতি সচেতনতা বাড়ে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।

প্রতি বছরের জানুয়ারিতে পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ পাখি মেলার আয়োজন করে থাকে। পাখি মেলাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, গবেষক, আলোকচিত্রী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা ভিড় করেন ক্যাম্পাসে। মেলায় পাখি দেখা প্রতিযোগিতা, পাখিবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি চেনা প্রতিযোগিতাসহ নানা ধরনের আয়োজন করা হয়। এদিন সকাল থেকেই দল বেঁধে শিশু, কিশোর-কিশোরী, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের আগমন দেখা যায় ক্যাম্পাসে। প্রতি বছরের মতো আগামী জানুয়ারিতে ২৫তম পাখি মেলা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। পাখি মেলার মতোই প্রজাপতি সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ব শাখা মেলার আয়োজন করে থাকে।

JU-Bird-01

ছবি: অরিত্র সাত্তার

প্রকৃতির এ দুই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয় শীতের পিঠার উৎসব। শীত মানেই গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠার কথা মনে পড়ে। সেই স্বাদ আর গন্ধ জাবি ক্যাম্পাসে এনে দেয় পিঠার উৎসব। ভাপা পিঠা, চিতই, পাটিসাপটা, দুধ চিতই, তিলের পিঠা—নানা রকম পিঠার স্টলে জমে ওঠে আড্ডা। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাইরের অতিথিরাও ভিড় করেন পিঠার স্টলগুলোতে। কেউ শীতের পুরনো স্মৃতি মনে করেন, কেউ প্রথমবার পরিচিত হন গ্রামবাংলার পিঠার স্বাদের সঙ্গে।

এ উৎসবগুলোর পাশাপাশি শীতের সময় জাবি ক্যাম্পাসে শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিভিন্ন বিভাগ, সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী দলের অংশগ্রহণে উৎসবগুলো আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পরিকল্পনা, আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। এতে তাদের মধ্যে নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও দলগত কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

উৎসব চলাকালে ক্যাম্পাসজুড়ে দেখা যায় আলাদা এক চিত্র। কোথাও দল বেঁধে ছবি তুলছেন শিক্ষার্থীরা, কোথাও চলছে গল্প আর হাসির আড্ডা। লেকপাড়ে বসে কেউ কেউ লিখছেন কবিতা, কেউ আঁকছেন প্রকৃতির ছবি। শীতের রোদ, পাখির ডাক আর মানুষের কোলাহল মিলিয়ে এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয়। এ সময়টুকু যেন দৈনন্দিন পড়াশোনা আর ব্যস্ততার বাইরে এক স্বস্তির বিরতি।

পরিবেশবিদদের মতে, পাখি ও প্রজাপতি মেলার মতো আয়োজন মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসে। এতে জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। শীতের এ উৎসবগুলো সেই পরিচিতিকে আরো দৃঢ় করে। একই সঙ্গে পিঠা উৎসব গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে।

অনেক দর্শনার্থীর কাছে জাবির শীতের উৎসব এক বিশেষ আকর্ষণ। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন ক্যাম্পাসে। শিশুদের কাছে পাখি আর প্রজাপতি দেখা যেমন আনন্দের, তেমনি বড়দের কাছে এটি স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেয়। এ মিলনমেলা মানুষে মানুষে দূরত্ব কমায়, তৈরি করে সম্পর্কের উষ্ণতা।

শীত শেষে উৎসবগুলো থেমে যায়, ক্যাম্পাস ফেরে তার চেনা রুটিনে। কিন্তু রয়ে যায় স্মৃতি, ছবি আর গল্প। পাখি মেলা, প্রজাপতি মেলা আর শীতের পিঠার উৎসব—এ তিন আয়োজন জাবি ক্যাম্পাসের শীতকে করে তোলে আলাদা, প্রাণবন্ত ও অর্থবহ। প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর মানুষের সম্মিলনে গড়ে ওঠা এ উৎসব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।