পরিবেশবিজ্ঞান আধুনিক বিশ্বের একটি বহুমাত্রিক, যুগোপযোগী ও দ্রুতবর্ধনশীল মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিষয়। এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের দ্রুত অবক্ষয়, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ নীতি—এমন নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন দক্ষ পরিবেশবিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়টি এখন শিক্ষা, গবেষণা, নীতি প্রণয়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পরিবেশবিজ্ঞানে কেন পড়বেন

বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের মতো সমস্যাগুলো ক্রমাগত বাড়ছে। এ সমস্যাগুলো আমাদের জীবনযাত্রার মান, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ পরিবেশবিজ্ঞানীদের চাহিদা বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান। পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়ন করে শিক্ষার্থীরা এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তাই এ সাবজেক্ট সম্ভাবনাময় ও ভবিষ্যৎমুখী। পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য অনেক বেশি দক্ষ পরিবেশবিজ্ঞানীর প্রয়োজন। যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী এবং বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রাখতে চান, তাদের জন্য পরিবেশবিজ্ঞান একটি আদর্শ বিষয়।

যা পড়ানো হয়

পরিবেশবিজ্ঞানে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থীকে জীববিজ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, পরিসংখ্যান, ইঞ্জিনিয়ারিং, ভূগোল, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, ফরেস্ট্রি, পানিসম্পদ, বায়ুমণ্ডলবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং আইনের মতো বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেসগুলো পড়ানো হয়, যাতে পরিবেশবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কলকারখানার দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এছাড়া শিক্ষার্থীরা পরিবেশবিজ্ঞানের বিশেষায়িত বিষয়গুলো যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য, টেকসই উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ নীতি এবং পরিবেশ আইন ইত্যাদি বিষয়ে গভীরভাবে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেন। এ কারণে বিষয়টি মূলত বিজ্ঞানমনস্ক এবং সমস্যা সমাধানমুখী শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ। এ বিষয়ের অধ্যয়ন ও গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলো হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব, বায়ু, পানি ও মাটি দূষণের প্রভাব ও প্রতিকার, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ উদ্যোগ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ নীতি, আইন ও অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য শক্তি ইত্যাদি। এগুলোই ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান।

কোথায় পড়বেন

পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে বিএসসি (অনার্স) ডিগ্রি নিতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে সাধারণত বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করার পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে পড়াশোনার জন্য আবেদন করতে হয়। গ্র্যাজুয়েট, পোস্টগ্র্যাজুয়েট বা গবেষণাভিত্তিক পিএইচডি ডিগ্রির জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানে সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ চালু করে। পরে ১৯৯৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে পাঠদান শুরু করে। প্রায় সমসাময়িক সময়ে ২০০০-০১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এখন অনেক পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ই এ বিষয়ে ডিগ্রি দেয়।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম সারির প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে ডিগ্রি দেয়া হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা শুরু করে ১৯৯৪ সালে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইউল্যাব, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিসহ আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পরিবেশবিজ্ঞান বিষয়ে পড়ানো হয়।

উচ্চশিক্ষার সুযোগ

ইউরোপ ও আমেরিকায় পরিবেশবিজ্ঞান খুবই জনপ্রিয় সাবজেক্ট। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, কোরিয়া, চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এ বিষয়ে পিএইচডি, মাস্টার্স ও গবেষণার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী এখন বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করছেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানের অনেক শিক্ষার্থী আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কোরিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশে মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি করছেন। উচ্চশিক্ষা শেষে বিদেশে সরকারি, বেসরকারি খাতে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও ভালো কাজের সুযোগ রয়েছে।

ক্যারিয়ার সম্ভাবনা

পরিবেশবিজ্ঞানে ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর দেশ-বিদেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা ল্যাব, উন্নয়ন সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুমুখী কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।

সরকারি চাকরি: পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পরিবেশ কর্মকর্তা, সহকারী পরিচালক, গবেষক, পরামর্শক এবং অন্যান্য পদে চাকরির সুযোগ রয়েছে।

বেসরকারি চাকরি: বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস সেক্টর, নির্মাণ কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা, কনসালট্যান্সি ফার্ম, রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, আইএলও, ইউএসএআইডি এবং অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হেলথ অ্যান্ড সেফটি অফিসার, কমপ্লায়েন্স অফিসার, পরিবেশ-স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা কর্মকর্তা, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন কর্মকর্তা, পরিবেশ প্রকৌশলী, কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার, পরিবেশ মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপক, প্রজেক্ট অফিসার, গবেষক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ প্রকৌশলসংক্রান্ত দায়িত্বরত কর্মকর্তা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্ট/পরামর্শক হিসেবে কাজের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোয় জলবায়ু সহনশীলতা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, কমিউনিটি প্রকল্পে প্রজেক্ট অফিসার, গবেষণা, অ্যাডভোকেসি, ফান্ডরেইজিং, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নভিত্তিক মাঠপর্যায়ের কাজে রয়েছে অবারিত সুযোগ।

ভবিষ্যৎ গুরুত্ব

বিশ্বব্যাপী গ্রিন ইকোনমি ও এসডিজি বাস্তবায়নের কারণে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ফলে পরিবেশবিজ্ঞান এখানে কেবল একটি ডিগ্রি নয়, একটি জরুরি প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান—সবখানেই পরিবেশ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন বাড়ছে। বাংলাদেশের যেসব শিক্ষার্থী এ বিষয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন তাদের অনেকে সরকারি চাকরি, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করছেন। পরিবেশবিজ্ঞান এমন একটি ক্ষেত্র, যা ভবিষ্যতের পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে, উন্নয়নকে পরিবেশবান্ধব করতে এবং মানবজীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহুমাত্রিক ক্যারিয়ার সুযোগ, উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত পথ এবং বাস্তবভিত্তিক কাজের ক্ষেত্র—সব মিলিয়ে পরিবেশবিজ্ঞান বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি সম্ভাবনাময়, মর্যাদাপূর্ণ এবং প্রভাববিস্তারী একাডেমিক সাবজেক্ট।

ড. মো. শিবলুর রাহমান

সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়