১০ অক্টোবর শনিবার সকাল। ভোরের আলো ফুরিয়ে দুপুরের ব্যস্ততা নামার আগেই ঢাকার বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মিলনায়তনে জড়ো হতে শুরু করেন একদল তরুণ। কেউ এসেছেন রাজধানী ঢাকার কোনো এক ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি হয়ে, কেউ পাড়ি দিয়েছেন দূরের পথ। তাদের প্রত্যেকের ভাবনায় শিক্ষা, স্বপ্নে বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা অধিকার সংসদের (সেজ) উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘এডুএনভয়’ নেটওয়ার্ক। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সমস্যা সমাধানে তরুণদের সম্পৃক্ত করাই ছিল এ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। আবেদন ও সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এ নেটওয়ার্ক। নির্বাচিতদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিয়ে স্নাতক করছেন। শিক্ষা নিয়ে যাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, তারাই এবার শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে হাঁটতে চান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ছিল পরিচিত হওয়ার নানা আয়োজন। এ সময় বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিনিময় করে নিয়েছেন নিজেদের ভাবনা ও প্রত্যাশাগুলোকে। তবে এ আয়োজন কেবল পরিচয়পর্ব কিংবা উপদেষ্টা ও অতিথিদের বক্তব্য দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে ছিল নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা। পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল শিক্ষার ভিন্ন সংকট ও সম্ভাবনা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে নিজ নিজ আইডিয়াগুলো সবার মাঝে তুলে ধরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেন সাঁওতালি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনার পরিকল্পনা। মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ যে শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে আরো সহজ ও অর্থবহ করে তুলতে পারে, তাদের উদ্যোগে সেই ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করতে চান সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনায় রয়েছে শিক্ষায় গেম প্রযুক্তির সমন্বয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থীরা গুরুত্ব দিয়েছেন অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায়।

এছাড়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বেছে নিয়েছেন ডিজিটাল সাক্ষরতার বিষয়টি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করবেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনায় রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা। বিষয় ও কর্মপরিসর আলাদা হলেও প্রতিটি পরিকল্পনার মূলে রয়েছে একই প্রত্যাশা। কোনো শিক্ষার্থী যেন পরিচয়, আর্থিক অবস্থা কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন। শিক্ষার্থীদের এসব পরিকল্পনা শোনেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। আয়োজনটিতে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পাঠ্যক্রম সমন্বয় কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলাম, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির (উন্নয়ন) প্রধান মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ এমএইচ তানসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম, ইউনেস্কোর শিক্ষা প্রোগ্রামের মো. রমজান আলী, আশা শিক্ষা কর্মসূচির প্রধান সামিউল হক এবং লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট জাকিয়া সুলতানা প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেজের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনওয়াজ খান চন্দন। তরুণদের এ উদ্যোগকে তিনি দেখছেন ভবিষ্যতের শিক্ষা অধিকারকর্মী ও পরিবর্তনের অগ্রদূত তৈরির বিনিয়োগ হিসেবে। তার মতে,”‘এডুএনভয়’ উদ্যোগ বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের শিক্ষা অধিকারকর্মী ও পরিবর্তনের অগ্রদূত তৈরিতে একটি বিনিয়োগ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে সোসাইটি ফর এডুকেশনাল জাস্টিস (এসইজে) তরুণদের শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য চিহ্নিত করা, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সমাধান প্রণয়ন এবং অর্থবহ সংস্কারে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য প্রস্তুত করতে চায়।

দিনের শেষ আয়োজন ছিল এডুএনভয়দের শপথ গ্রহণ। শপথের পর ছবি তোলার জন্য এক ফ্রেমে দাঁড়ান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দিনশেষে তাদের পরিচয় শুধু নিজ নিজ ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নয় বরং তারা যুক্ত হলেন একটি সম্মিলিত যাত্রায়। সামনে একশ দিনের রোডম্যাপ। সাঁওতালি ভাষায় পাঠ্যবই রচনা থেকে ডিজিটাল সাক্ষরতা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার—প্রতিটি পরিকল্পনার বাস্তবায়নেই অপেক্ষা করছে নানা চ্যালেঞ্জ। তবু এ তরুণদের উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন কেবল নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও সক্রিয় অংশগ্রহণও সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এখন দেখার বিষয়, স্বপ্ন ও পরিকল্পনার এ যাত্রা আগামীতে কতটা এগিয়ে যায়।

মালিহা মেহনাজ: এডুএনভয়, শিক্ষা অধিকার সংসদ ও শিক্ষার্থী , শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়