দেশের বাজারে বেশ কিছুদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী এলাচের দাম। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে মসলাপণ্যটির বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এর পেছনে আড়তদারদের কারসাজি রয়েছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। গত কয়েকদিনে পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম বেড়েছে কেজিতে ৩০০ টাকা।
বিশ্ববাজারের ফিউচার ট্রেডিংয়ে প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের দাম কমছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারে। লোকসান এড়াতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ঝুঁকছেন দামি মসলাপণ্য এলাচে। ফলে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। আমদানির পর এখানকার ট্রেডিং ব্যবসায়ী, ডিও ব্যবসায়ী ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সারা দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করেন। পণ্য সরবরাহের আগে পণ্যটির ডিমান্ড অর্ডার বা ডিও কয়েক হাত ঘুরে পাইকরি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে। আর প্রতিবার হাতবদলের সময় দাম বাড়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা।
পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৬০ টাকায়। যদিও সরাসরি পাইকারি দোকান কিংবা খুচরা পর্যায়ে এলাচ বিক্রি হচ্ছে কয়েকশ টাকা বেশি দামে। ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদ থাকা এলাচের ট্রেডিং দর ১ হাজার ৮৬০ টাকায় উঠলেও ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেয়াদি এলাচ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে। মূলত পাইকারি ব্যবসায়ী ও ডিও ব্যবসায়ীদের এলাচ ক্রয় কিংবা স্লিপ ক্রয়ের কারণে পণ্যটির দাম প্রতিদিনই বাড়ছে।
নাম প্রকাশ না করে খাতুনগঞ্জের এক ডিও ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি এলাচের দাম ৪ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় আমদানি সংকট, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে কৃত্রিমভাবে এলাচের দাম বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানেও বিশ্ববাজারে এলাচের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কথা বলে এলাচে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে দামও বাড়ানো হচ্ছে। প্রশাসনের নজর কম থাকার কারণে সহজেই দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে গরমমসলার মধ্যে জনপ্রিয় এলাচের বার্ষিক চাহিদা তিন-সাড়ে তিন হাজার টন। প্রতি বছর বিশ্ববাজার থেকে চার হাজার টনের মতো এলাচ আমদানি হয়। কয়েক বছর ধরে এলাচের পাইকারি বাজার কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১৮ সালে ভারতের কেরালায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে চাহিদার চাপে পণ্যটির বুকিংও বেড়ে যায়। পাশাপাশি গুয়াতেমালায় এলাচ উৎপাদন কম হওয়ায় পণ্যটির দামে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর সুযোগ নিতে দেশের ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারে অধিকাংশ ব্যবসায়ী এলাচে বিনিয়োগ শুরু করেন এবং দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি এলাচ উৎপাদন হয় মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়াতেমালায়। আর এলাচের সবচেয়ে বড় ভোক্তা দেশ ভারত। মসলা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেপ্টেম্বরে গুয়াতেমালা ও ভারতে নতুন মৌসুমের এলাচ উত্তোলন শুরু হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ভোজ্যতেলসহ প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকায় ডিও ও স্লিপ ক্রয়ের মাধ্যমে দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে। সাধারণত তেল ও চিনির জন্য ডিও বা বর্তমানে এসও প্রথা প্রচলিত। তবে যখন কোনো পণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকে তখনই পণ্যটির ডিও ছেড়ে বাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা করেন ব্যবসায়ীরা। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর একসময় চাহিদা কমে গেলে সর্বোচ্চ দামে ক্রয় করা ব্যবসায়ীরাই লোকসানের মধ্যে পড়েন।
জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাইকারি বাজারের সিংহভাগ ব্যবসায়ীই এখন এলাচ কিনছেন। যার কারণে বাড়তি চাহিদায় এলাচের দাম এক মাসের মধ্যে কেজিতে ৫০০ টাকা বেড়েছে। গত কয়েকদিনেই বেড়েছে ৩০০ টাকা। এভাবে বাড়তে থাকলে এলাচের বাজার নিয়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।










