নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্ব কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা এতই কমেছে যে দাম গিয়ে ঠেকেছে শূন্যেরও নিচে। ২০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শূন্যে গিয়ে ঠেকেছে। পরের কার্যদিবসে পণ্যটির দাম কিছুটা বাড়লেও তা এখনো মাইনাস প্রাইসিং পর্যায়েই অবস্থান করছে। এ অবস্থার শিগগিরই কোনো উন্নতি দেখছে না খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং কোম্পানি গোল্ডম্যান স্যাকস সম্প্রতি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের দাম পুনরুদ্ধার হতে আরো কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে। খবর রয়টার্স ও অয়েলপ্রাইসডটকম।

গোল্ডম্যান স্যাকসের পণ্য বাজারের প্রধান জেফ্রি কারি বার্তা সংস্থা সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের বাজারে চাঙ্গা ভাব সহসাই ফিরছে না। প্রতিষ্ঠানটির এ সতর্কবার্তা নোটের কারণ হলো—অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন কমিয়ে আনা খুব সাধারণ বিষয় নয়। এটা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনই প্রচুর ব্যয়বহুল বিষয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সক্ষমতার তুলনায় উত্তোলন কমিয়ে আনলে পণ্যটির কূপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের কোনো সচল কূপ হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটা ব্যয়বহুলও বটে। এছাড়া এ কারণে কখনো কখনো কূপটি চিরকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। ফলে এ বিষয়ে ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ পরিস্থিতিতে খুব সহসাই জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে বলে মনে করছেন না তারা। আগামী মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত পণ্যটির বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গতকাল কার্যদিবস শেষে ডব্লিউটিআইয়ের দাম আগের দিনের তুলনায় কমে ব্যারেলপ্রতি মাইনাস ৩৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদায় চাঙ্গা ভাব ফিরতেও বিলম্ব হতে পারে বলে জানিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যটির মজুদ স্পেসগুলো এরই মধ্যে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যান্য দেশের অবস্থাও মোটামুটি একই। এ পরিস্থিতি জ্বালানি পণ্যটির বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

অপরিশোধিত তেলের দামের এ ব্যাপক পতনের কারণ হিসেবে করোনাকেই দায়ী করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। করোনা রুখতে অনেক দেশই লকডাউনের পথে হেঁটেছে। জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত বন্ধ রয়েছে পরিবহন সেবাসহ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক গড়ে তিন কোটি ব্যারেল কমে গেছে। চাহিদা কমায় হু-হু করে কমছে দাম। অবশ্য কভিড-১৯-এর আগেই সৌদি-রুশ মূল্যযুদ্ধের জেরে ধাক্কা খায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার। মূল্যযুদ্ধের জেরে গত মাসে জ্বালানি পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলার থেকে কমতে কমতে ২০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে।

এ অবস্থায় বাজারে ভারসাম্য ফেরাতে ওপেক-নন ওপেক দেশগুলোকে চাপ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি তেলের উত্তোলন দৈনিক গড়ে ৯৭ লাখ ব্যারেল কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজের (ওপেক) সদস্য ও মিত্র দেশগুলো, যা পণ্যটির মোট বৈশ্বিক সরবরাহের ১০ শতাংশ। ওপেকের ইতিহাসে আগে কখনই পণ্যটির উত্তোলন এতটা কমায়নি। আগামী ১ মে থেকে নজিরবিহীন এ চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু জোটটির এ সিদ্ধান্তে জ্বালানি তেলের বাজারের পতন কতটা ঠেকানো সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।