কয়েক
মাস ধরে দেশে পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান সেজন্য গত মার্চের মাঝামাঝিতে
আমদানি বন্ধ রাখা হয়। এতে দেশীয় পেঁয়াজের বাজার বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। সম্প্রতি দেশীয় বাজার স্থিতিশীল না হওয়ায় পেঁয়াজ
আমদানির ঘোষণা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। মন্ত্রীর এ ঘোষণার পর
একদিনেই পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি কমেছে ১০ টাকা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম উঠেছিল সর্বোচ্চ ৮০ টাকা। যা চলতি মৌসুমে পাইকারিতে পেঁয়াজের সবচেয়ে বেশি দাম। আমদানি বন্ধ থাকায় দেশীয় পেঁয়াজের দাম বাড়ায় কৃষক ও গ্রামাঞ্চলের ব্যাপারীরা পেঁয়াজে লাভবান হচ্ছিল। কিন্তু আমদানির সুযোগ না দেয়া, এলসি সংকটে আমদানি না হওয়ার গুজবে পণ্যটির দাম প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছিল। সর্বশেষ বাণিজ্যমন্ত্রী নিত্য পণ্যের বিষয়ে কথা বলার পর নিম্নমুখী হয়েছে বাজার। শনিবার পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৬৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭২ টাকায়। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে পেঁয়াজের বাজার এ দামে স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
খাতুনগঞ্জের মসলা পণ্য আড়তদারপ্রতিষ্ঠান মেসার্স ইরা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ থাকায় দেশীয় পেঁয়াজে ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। বর্তমান দরে বিক্রি হলে কৃষকরা লাভের ধারায় ফিরেছেন। তবে আমদানির অনুমতি পাওয়া যাবে না এসব গুজবে পণ্যটির দাম অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আমদানির ইঙ্গিতে পণ্যটির দাম কয়েক সপ্তাহ পর প্রথম নিম্নমুখী ধারায় ফিরেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে পেঁয়াজের লাভসহ প্রকৃত দামে লেনদেনের সুযোগ পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সারা দেশে পাবনা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলায় পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি। চলতি বছর রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদিত পেঁয়াজের গুণগত মানও ভালো। যার কারণে বিদেশী পেঁয়াজের সরবরাহ না থাকলেও ক্রেতারা দেশীয় পেঁয়াজ সংগ্রহ করছে স্বাচ্ছন্দ্যে। মৌসুমের শেষার্ধে উৎপাদিত হালি পেঁয়াজের পাশাপাশি বড় জাতের কিং পেঁয়াজের সরবরাহ থাকায় ভারতীয় পেঁয়াজের অভাব বোধ হয়নি ক্রেতাদের। দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ থাকায় আমদানি করেও চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। তবে আসন্ন কোরবানির ঈদের বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে মজুদ প্রবণতার কারণে পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিকের তুলনায় দাম বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
আড়তদার সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে দেশীয় পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকলেও বৃহত্তর চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো আমদানি করা পেঁয়াজ। মেজবানসহ মাংসজাতীয় খাবারের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় জাতের ভারতীয় নাসিক পেঁয়াজের চাহিদাই বেশি থাকে। তবে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে সরকার আমদানি বন্ধ করে দেয়ায় দেশীয় পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে এখানকার ক্রেতারা। রবি মৌসুমের শেষার্ধে চট্টগ্রামে দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ একেবারে শূন্যের কোটায় নেমে এলেও এ বছর প্রতিদিন ২৫-৩০ ট্রাক দেশীয় পেঁয়াজ সরবরাহ হয় চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারগুলোয়। সর্বশেষ কয়েকদিন ধরে পাইকারি বাজারের পাশাপাশি খুচরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৮০ টাকা দরে। শনিবার দাম কমে আসায় খুচরা বাজারেও পেঁয়াজের দাম কমে আসবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশের মোট পেঁয়াজ চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ আমদানিনির্ভর ছিল। মূলত মৌসুমে দেশীয় পেঁয়াজের পাশাপাশি ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করত দেশের ব্যবসায়ীরা। ভারতের নাসিক, কানপুর, দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পেঁয়াজের অন্যতম বাজার ছিল বাংলাদেশ। কয়েক বছর ধরে দেশে পেঁয়াজের সংকট, সবচেয়ে চাহিদা মৌসুমে ভারত থেকে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার কারণে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে কয়েক বছর ধরে সরকার পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার চেষ্টা করছে। সর্বশেষ মৌসুমে চাহিদার চেয়েও বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন করায় গত মার্চে আমদানি বন্ধ করে দেয়। কয়েকদিন আগেও কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকায় পেঁয়াজ পাওয়া গেলেও সর্বশেষ শুক্রবার তা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে। ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতির খবরে আবারো একদিনের ব্যবধানে দিনাজপুরের হিলিতে দেশীয় পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ৯-১২ টাকা। একদিন আগে প্রতি কেজি দেশীয় পেঁয়াজ ৭৫-৮০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা কমে ৬৬-৬৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
শনিবার দুপুরে সরেজমিন হিলি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের প্রায় প্রতিটি দোকানেই দেশীয় পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ লক্ষ করা গেছে। তার পরও সরবরাহ কমের অজুহাতে দাম ওঠানামা করছে। এদিকে পেঁয়াজের এমন দামের কারণে অনেকেই ক্রয় কমিয়ে দিয়েছেন। এতে বাজারে পেঁয়াজের তেমন একটা ক্রেতা লক্ষ করা যায়নি। যারাও আসছেন তারাও আগের তুলনায় পরিমাণ কমিয়ে পেঁয়াজ কিনছেন।
হিলি বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকদিন ধরেই পেঁয়াজের দাম বাড়তি। এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে বেশ সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।’
হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক সেলিম হোসেন বলেন, ‘দেশীয় কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে গত ১৫ মার্চের পর থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি বন্ধ রেখেছে সরকার। এতে দুই মাসের বেশি সময় ধরে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে চলেছেন। এখন কিন্তু কৃষকের ঘরে তেমন পেঁয়াজ নেই, অধিকাংশ পেঁয়াজ মজুদদারদের ঘরে রয়েছে। যে কারণে দেশে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে।’










