বাংলাদেশে আমদানি করা স্ক্র্যাপ জাহাজগুলো বিষাক্ত বর্জ্য কিংবা রাসায়নিক পদার্থ নিয়েই প্রবেশ করে শিপইয়ার্ডগুলোতে। চলে আসছে বিপজ্জনক পদার্থও। এদিকে স্ক্র্যাপ জাহাজ চড়ে কী পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য কিংবা বিপজ্জনক রাসায়নিক থাকে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য লোকবল নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের। আবার এসব বিষয়ে কর্মকর্তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ কিংবা তেমন কোনো যন্ত্র না থাকায় জাহাজের সার্বিক প্রতিবেদন তৈরিতেও দেখা দেয় সংকট। তাই উন্নত প্রশিক্ষণসহ ইয়ার্ডের বাইরে নোঙর করা জাহাজের বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্তকরণে গবেষণা করতে মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব পাঠিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। আর সেটি বাস্তবায়ন করা হলে জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য আলাদা একটি গবেষণাগার তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, স্ক্র্যাপ জাহাজে কী ধরনের বিষাক্ত বর্জ্য বা বিপজ্জনক পদার্থ থাকতে পারে সেটা আইএইচএম (ইনভেন্টরি অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস) রিপোর্ট থেকে জানা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে যেসব স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয় সেখানে যথাযথভাবে প্রতিবেদনটি প্রদর্শন করা হয় না। তাই চলতি বছরে ‘স্টাডি অন ক্যাপাসিটি ইন আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট অব হ্যাজার্ডস ম্যাটেরিয়ালস ইন স্ক্র্যাপ শিপস অ্যাট দি আউটার এনকারেজ’ শীর্ষক একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায় পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়। প্রকল্পটির জন্য প্রাথমিক বাজেট ধরা হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। আর সেই প্রকল্পের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হলে শিপইয়ার্ডের বিষাক্ত বর্জ্য ও বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্তকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে পরিবেশের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়াও সম্ভব হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (জেলা) মো. ফেরদৌস আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, জাহাজ ভাঙা শিল্পের আমদানিতে স্ক্র্যাপ জাহাজ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। এসব জাহাজে মূলত বিষাক্ত বর্জ্য চলে আসে, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। সে কারণেই আমরা মন্ত্রণালয়কে গবেষণা কিংবা সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের জন্য একটি প্রস্তাব দিয়েছি। যদি মন্ত্রণালয় বিষয়টি অনুমোদন দেয় তাহলে যেসব স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হচ্ছে, সেগুলো সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আমাদের কাছে থাকবে। কোনো বিষাক্ত জাহাজ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায় ঢুকছে কিনা, সে বিষয়ে আমরা আগম জানাতে পারব। মূলত পরিবেশের কথা চিন্তা করেই আমরা এ প্রস্তাব পাঠিয়েছি।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মাদাম বিবির হাট, কুমিরা, ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি, জাহানাবাদ, কদমরসূল, বাঁশবাড়িয়া ও মিরসরাই উপকূলজুড়ে গড়ে উঠেছে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন অনুযায়ী, শিপইয়ার্ডে থাকা জাহাজ কাটা শুরুর আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। কারণ এসব জাহাজে অ্যাজবেস্টস, ভারি ধাতু, খনিজ তেল, জাহাজের তলা ও ব্যালাস্ট ওয়াটার, পলিসাইক্লিক অ্যারোমাটি হাইড্রোকার্বন, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (পিসিবি), বিষাক্ত রঙ ট্রাইবিউটাইলটিন (টিবিটি), স্লাজ অয়েল, অর্গানোটিন, গ্লাসহোল, লুব্রিক্যান্ট অয়েলসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকে। কিন্তু এসব বর্জ্য ব্যবস্থার জন্য আলাদা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩৫টির বেশি শিপইয়ার্ডে সরেজমিনে গিয়ে এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ফলে বিভিন্ন গবেষণায় শিপইয়ার্ড এলাকার মাটিতে সিসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, পারদ, অ্যাসবেস্টস ও নানা ভারী ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত অয়েল ট্যাংকার বেশি আমদানি করা হয়। আর আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা স্ক্র্যাপ হিসেবে জাহাজগুলো যখন কেনেন তখন তারা পরিবেশের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। এসব কারণে স্ক্র্যাপ হিসেবে আমদানি করার সময় বর্জ্য বোঝাই করে জাহাজ দেশে আনা হয়। এসব বর্জ্য এখানেই ডাম্পিং করা হয়। সেজন্য কোন স্ক্র্যাপ জাহাজে কী পরিমাণ বর্জ্য আসছে সেটা জানা জরুরি। সেই সঙ্গে এসব বর্জ্য শনাক্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কিংবা বেসরকারি পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের কারিগরি শিক্ষা দেয়াও প্রয়োজন। তাই এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।