ইরানের অর্থনীতিতে সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। দেশটির তেল রফতানি প্রায় বন্ধ। বিদেশে থাকা নিজেদের অর্থও দেশে নিতে পারছে না তেহরান। এর মধ্যেই মূল্যস্ফীতি ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কমছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাড়ছে বেকারত্ব। জ্বালানি সরবরাহেও রেশনিং করতে হচ্ছে। এসবের প্রভাব পড়েছে দেশটির মুদ্রা রিয়ালে। গত মঙ্গলবার ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর নেমেছে রেকর্ড ২৫ লাখের বেশি। খবর ফরচুন।
এর আগে যুদ্ধের ভয়াবহতা সত্ত্বেও তেহরান দাবি করেছিল, দেশটির বিশেষ অর্থনৈতিক মডেল রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করবে। তবে সংঘাতের সাত মাস পেরিয়ে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে ইরানের তেল রফতানি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো, যেমন সৌদি আরব, ইউএই মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তার অধীনে কোনো বাধা ছাড়াই জ্বালানি তেল বিক্রি ও সরবরাহ বাড়িয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়ে এসেছে।
জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ইরানের রফতানি টার্মিনাল থেকে কোনো জ্বালানি তেল জাহাজে তোলা হয়নি। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। সংস্থাটির অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহি এ তথ্য জানান।
জ্বালানি তেল রফতানি বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়ছে ইরানের অর্থনীতির অন্য খাতেও। সমুদ্রপথে পণ্য আমদানি করতে পারছে না দেশটি। স্থলপথে পণ্য আনার সুযোগ থাকলেও সেসব পথেও ব্যাপক জট তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্যে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। চলতি বছর দেশটির জিডিপি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে বেকারত্বও বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রিয়ালের দরপতন আরো তীব্র হয়েছে। গত সপ্তাহে তেহরানের বাজারে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দাম রেকর্ড পর্যায়ে নেমে যায়। ১ ডলারের বিনিময়ে ২৫ লাখের বেশি রিয়াল লেনদেন হয়েছে ওইদিন।
এর আগে গত শুক্রবারও রিয়ালের রেকর্ড দরপতন হয়েছিল। সেদিন ১ ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য নেমে যায় ২২ লাখে।
বছরের শুরুতেও ১ ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দাম ছিল প্রায় ১৫ লাখ। ২০২৫ সালের আগস্টে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর ছিল প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইরানের মুদ্রার দরপতন হয়েছে প্রায় ১৭০ শতাংশ। আরো পেছনে তাকালে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়। ২০১৮ সালের শুরুতে ১ ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর ছিল ৩৫ হাজার।
প্রতিবেদন বলছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় বাজেটেও জ্বালানি তেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট সরকারি বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে। এছাড়া ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অর্থায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস এ তেল।
বিদেশে থাকা অর্থ দেশে আনতেও জটিলতায় পড়ছে ইরান। গত সপ্তাহে ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘চীনে থাকা ইরানের অর্থ আটকে আছে। ফলে নিজেদের পণ্য বিক্রির পর পাওয়া অর্থও দেশটিতে পৌঁছতে পারছে না।’
সব মিলিয়ে ইরানের অর্থনীতির ওপর একসঙ্গে কয়েকটি চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে তেল রফতানি প্রায় বন্ধ। অন্যদিকে বিদেশে থাকা অর্থ দেশে নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া আমদানির পথও বাধাগ্রস্ত। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যেই রিয়ালের দরপতন নতুন রেকর্ড গড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেল থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে।
তবে এত চাপের মধ্যেও বিশ্লেষকরা বলছেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে ইরান প্রতিরোধ অর্থনীতি নামে এক বিশেষ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে বর্তমান চাপের মুখেও ইরানের অন্তত এক বছর টিকে থাকার সক্ষমতা আছে বলে মনে করছেন অনেকে।
‘প্রতিরোধ অর্থনীতির’ মূল ভিত্তি হলো আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। ইরান বর্তমানে ওষুধ, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিকস পণ্য নিজেরাই তৈরি করছে, যা তারা বাইরে থেকে আমদানি করতে পারে না। এছাড়া বার্টার বা পণ্য বিনিময় প্রথাও ইরানের টিকে থাকার একটি বড় হাতিয়ার বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। নিষেধাজ্ঞার ফাঁদ এড়াতে তেলের বিনিময়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করছে দেশটি।










