একটা কথা প্রচলিত আছে—প্রত্যেকটি সমস্যাই একটি সুযোগ তৈরি করে। নভেল করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এ সুযোগটা ঠিক কী তা এখনো অনিশ্চিত। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের আধিপত্য বাড়ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। 

প্রাণঘাতী কভিড-১৯ এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে চলেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদায় শ্লথতা এসেছে, যা প্রভাবিত করেছে এলএনজি শিল্পকেও। চাহিদা হ্রাসের জেরে জ্বালানি পণ্যটির দাম রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। আর এ সুযোগে সস্তায় এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর পথ ধরেছে চীন।

ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ অনেকটা চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করা হয়েছিল। প্রাণঘাতী ভাইরাসটির বিস্তার রোধে তখন আপ্রাণ চেষ্টা চালায় চীন। হুবেই প্রদেশসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চল লকডাউনে রাখা হয়। লকডাউনের কারণে চীনের অর্থনীতিতে মারাত্মক ধাক্কা লাগে। দেশটি তখন বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ এলএনজি আমদানিকারক দেশ। এ অবস্থায় দেশটিতে এলএনজিসহ সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের চাহিদা কমতে শুরু করে, সেই সঙ্গে দাম। তবে খুব দ্রুতই ভাইরাসটি চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হানা দিতে শুরু করে। ফলে একের পর এক দেশ লকডাউন কার্যকর করতে শুরু করে। ভাইরাসটি পরিণত হয় বৈশ্বিক মহামারীতে। এ পরিস্থিতিতে এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদা রেকর্ড কমিয়ে চাপ তৈরি করে দামের ওপর। এদিকে প্রাণঘাতী ভাইরাসটির প্রকোপ রোধে অনেক দেশ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন চীনের পরিস্থিতি অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে।

অবশ্য কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের আগে থেকেই এলএনজি বাণিজ্যে চীনের আধিপত্য অনেকটা প্রকাশিত হয়েছিল। জাপানকে টপকে বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি আমদানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার খুব কাছেই ছিল বেইজিং। পরিবেশ ইস্যুতে বেশ কয়েক বছর ধরে কয়লার পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছিল দেশটি। ফলে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা দিন দিন বাড়ছিল, যা চীনকে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করছিল।

এ পরিস্থিতিতে এলএনজির শীর্ষ উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশগুলো নজর দিতে শুরু করে চীনের বাজারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাতারকে টপকে ২০১৯ সালে এলএনজির শীর্ষ রফতানিকারকে পরিণত হয় অস্ট্রেলিয়া, যা চীনে ব্যাপক হারে রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্জন করতে পেরেছিল দেশটি। তবে বসে থাকেনি কাতারও। নিজেদের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে মেগা প্রজেক্ট হাতে নেয় দেশটি। প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বের শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র নর্থ ডোম ফিল্ড থেকে স্বআরোপিত স্থগিতাদেশ তুলে নেয় দোহা এবং ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৪৮ মেগা টন (প্রতি মেগা টনে ১০ লাখ টন) প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেশটি, যা ২০১৮ সালে এলএনজির বৈশ্বিক উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে মূলত এশিয়ার বাজারকে লক্ষ্য করে এলএনজির কৌশলগত পথ নির্ধারণ করে রাশিয়া। ২০২৪ সালের মধ্যে বছরপ্রতি ৪৬-৬৫ মেগা টন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতার অভিপ্রায় প্রকাশ করে মস্কো, যা ২০৩৫ সাল নাগাদ ৭০-৮২ মেগা টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ছুটছে দেশটি। 

এদিকে কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে চাহিদা কমা সত্ত্বেও থেমে থাকেনি চীনের এলএনজি আমদানি, উল্টো বেড়েছে। এ সময়ে দেশটির বেশির ভাগ অর্থনৈতিক খাত লকডাউনের আওতায় থাকায় জ্বালানি পণ্যটির মজুদ বেড়েছে। এরপর পণ্যটির আমদানি যখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে, দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল করপোরেশন, যা দেশটির শীর্ষ এলএনজি ক্রেতা, বাজার থেকে কার্যত অস্তিত্বহীন থেকেছে। কারণ কোম্পানিটির বেশির ভাগ এলএনজি স্টোরেজ এরই মধ্যে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক এনার্জি কনসালট্যান্টিং এফজিইর বিশ্লেষক অ্যাডমুন্ড সিয়াও বলেন, এলএনজির বৈশ্বিক দুর্দিনের সুযোগ নিতে চীনের ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত রয়েছেন। শুধু চীনই নয়, পণ্যটির স্বল্পমূল্যের সুযোগ নিয়ে মজুদ বাড়াতে চাইছে অন্য আমদানিকারক দেশগুলোও।

জ্বালানি বাজারের তথ্য সরবরাহকারী প্যারিসভিত্তিক কোম্পানি কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ মার্চ শেষ হওয়া সপ্তাহে চীনের কোম্পানিগুলো প্রায় ১২ লাখ ৬০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো দেশটির সাপ্তাহিক এলএনজি আমদানি ২০১৯ সালের গড় সাপ্তাহিক আমদানিকে ছাড়িয়ে গেছে।

এ বিষয়ে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং লি বলেন, বর্তমানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসের অন্যতম নিম্নপর্যায়ে অবস্থান করছে। চীনকে অবশ্যই এর সুযোগ নিতে হবে। পুনরায় দাম বাড়ার আগে দেশটিকে পণ্যটির কৌশলগত মজুদ বাড়িয়ে নিতে হবে। এলএনজিসহ অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর হবে। 

তবে চীনে এলএনজির চাহিদা যতই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠুক, পণ্যটির শীর্ষ রফতানিকারক দেশগুলোর দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না। কারণ কেউ জানে না পণ্যটির বাজারের এ অনিশ্চয়তা আরো কতদিন অব্যাহত থাকবে। জাপান ও উত্তর কোরিয়াসহ জ্বালানি পণ্যটির অন্য শীর্ষ বাজারগুলোর কভিড-১৯ সম্পর্কিত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক গতি পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর করছে পণ্যটির ভবিষ্যৎ। তবে যা-ই হোক একটা বিষয় নিশ্চিত, সর্বশেষ পরিস্থিতিতে এলএনজির একমাত্র অবলম্বনের ত্রাতা হয়ে উঠেছে চীন, যা পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির আধিপত্য আরো বাড়িয়ে তুলবে। 

অয়েলপ্রাইসডটকম ও ইয়াহু ফিন্যান্স অবলম্বনে