নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের এ সময়ে বাজারে বেশির ভাগ ভোগ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চাল, ডাল, তেল, আটা, ময়দা ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম। বাজারদর অনুযায়ী গত এক মাসে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে বাড়তি আমদানি সত্ত্বেও করোনা মহামারীর দুর্যোগ পরিস্থিতিতে আমদানিকারকদের মজুদপ্রবণতায় এসব পণ্যের বাজার অস্থির রয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৭৭-১২৫ টাকায়। এর মধ্যে আমদানি করা মসুর ডালের দাম তুলনামূলক কম। দেশে উৎপাদিত ডালের দাম বেশি।
গতকাল বাজার ঘুরে কানাডা থেকে আমদানি করা প্রতি কেজি মসুর ডাল ৭৭-৭৮ টাকা এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা মসুর ডাল কেজিপ্রতি ৮০-৮১ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। মার্চ মাসের শেষ দিকেও পাইকারি বাজারে আমদানি করা এসব পণ্যের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪০-৪৫ টাকা। সেই হিসেবে এক মাসে পণ্যটির দাম কেজিতে ৪৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
গতকাল পাইকারি বাজারে দেশে উৎপাদিত প্রতি কেজি মসুর ডাল বিক্রি হয় ১২০-১২৫ টাকায়। করোনা পরিস্থিতির আগে বাজারে দেশী মসুর ডাল কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি ডাল ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে দফায় দফায় ডালজাতীয় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে ডালজাতীয় পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মসুর ডালের দাম। এ সময়ের মধ্যে প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।
পাইকারি ডাল ব্যবসায়ী ও মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, গত এক-দেড় বছরের মধ্যে আমদানি করা মসুর ডালের কেজি ৫০ টাকা পেরোয়নি। তবে এবার পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধি রেকর্ড ছুঁয়েছে। গত সপ্তাহে আমদানি করা মসুর ডালের কেজি ৯০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
মূল্য বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সব ধরনের ডালের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে মসুর ডালের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। একসঙ্গে হঠাৎ করে বাড়তি চাহিদার কারণে আমদানিকারকরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন আমদানিকারকরা। এরপর পাইকারি পর্যায়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরাও আরেক দফা দাম বাড়িয়েছেন। ফলে পণ্যটির কেজি ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা মসুর ডালের সিংহভাগ এখন কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে মজুদ হয়ে আছে। করোনা পরিস্থিতিতে মার্চের শেষ দিকে মসুর ডালের বাজার বাড়তে শুরু করলে কয়েকজন ব্যবসায়ী বাজারের বেশির ভাগ মসুর ডাল মজুদ করে ফেলেন। এতে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে যায় গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে। ফলে দামও বাড়তে থাকে।
চট্টগ্রাম ডাল মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ আমু বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে যে পরিমাণ মসুর ডাল আমদানি হয়েছে, তাতে দাম বাড়ার কথা ছিল না। কিন্তু একসঙ্গে মসুরের অতিরিক্ত চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন আমদানিকারকরা। সেই সঙ্গে বাজারের সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা পণ্যটি কিনে মজুদ করে ফেলেছেন। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে ও পণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে।
খাতুনগঞ্জের ডাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স সুমন ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী সঞ্জয় দেব খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে মসুর ডালের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির বুকিং দর বেড়েছে। দেশে চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা পণ্যটি মজুদ করেছেন। এতে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে পণ্যটির দাম দফায় দফায় বেড়েছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সাড়ে চার মাসেরও কম সময়ে (১ জানুয়ারি থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৪ টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মসুর ডাল আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৩ টন। সেই হিসেবে মাত্র সাড়ে চার মাসেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ হাজার ৬৬১ টন বাড়তি মসুর ডাল আমদানি হয়েছে।









