বহুল প্রতীক্ষিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও দক্ষিণ আমেরিকার পাঁচ দেশের জোট মার্কোসুর গ্রুপ। এ লক্ষ্যে চলতি বছরের মধ্যে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সমাধানে পৌঁছনোর উদ্যোগ নিয়েছে উভয় পক্ষ। বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে চুক্তিসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়া নিয়ে মার্কোসুর গ্রুপ গঠিত। এসব দেশ ইইউর রফতানির প্রধান গন্তব্য। ইউরোপিয়ান কমিশনের মতে, এ চুক্তি স্বাক্ষর হলে ৭৮ কোটি ভোক্তার একটি বাজার তৈরি হবে। একই সঙ্গে বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় করতে পারবে ইউরোপের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। দক্ষিণ আমেরিকার এ পাঁচ দেশে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি ইউরোর বিনিয়োগ আছে তাদের।
বাণিজ্য চুক্তিটি প্রায় দুই দশক ধরে প্রক্রিয়াধীন। তবে ফ্রান্সের আপত্তি সত্ত্বেও সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো চুক্তিটি স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভর করছে। ইইউর এক কূটনীতিক বলেছেন, ‘এটা এখন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গত জানুয়ারিতে চুক্তির বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘এ চুক্তির প্রভাবে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া কৃষকরাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। এক্ষেত্রে ফ্রান্সকে সমর্থন দেয় অস্ট্রিয়া। তবে ইইউর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মত ছিল চুক্তির পক্ষে।’
ইইউর কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এখন ফ্রান্সের বিরোধিতাকে পাশ কাটাতে চাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে এতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোর দিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ব্যাপারে বলা হয়েছে।
এর আগে ২০১৯ সালে চুক্তির বিষয়ে প্রথমবারের মতো সম্মত হয় পক্ষগুলো। তখন থেকে এ ব্যাপারে স্থবিরতা চলে আসছে। জার্মানি, স্পেনসহ ইইউভুক্ত অনেক দেশ এ চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে শক্ত সমর্থন জানিয়ে আসছে। তাদের বিশ্বাস, চুক্তিটি উভয় অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সেতুবন্ধ রচনা করবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এ সময়ে চুক্তিটি উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হবে।
এর আগে ইইউর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন চুক্তি চূড়ান্ত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আগামী নভেম্বর ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জি২০ সম্মেলনেও অংশগ্রহণের কথা আছে তার। সেখানে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডা সিলভার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন উরসুলা।
ইইউর এক কর্মকর্তা জানান, চুক্তির বিরোধপূর্ণ আরেকটি বিষয় ইইউর জন্য পৃথক বন উজাড়বিরোধী আইন, যা আগামী বছর কার্যকর হবে। আইনটির আওতায় বন ধ্বংস করে উৎপাদিত কাঠ, গরুর মাংস ও কফির মতো পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা হবে। মার্কোসুর চায় এ আইনের ফলে তাদের রফতানিকারকরা যেন বাণিজ্য চুক্তির সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত না হয়।
এদিকে ‘পারমেজান’ চিজের মতো সংরক্ষিত নাম ব্যবহার না করার জন্য আর্জেন্টিনার ওপর চাপ দিচ্ছে বেলজিয়াম। এটিও চুক্তি স্বাক্ষরে বাধা তৈরি করছে। এছাড়া ব্রাজিল চাইছে তাদের গাড়ি নির্মাণ শিল্পও যেন চুক্তির নেতিবাচক প্রভাবের মুখে না পড়ে।
অন্যদিকে বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে ইউরোপের কৃষকরাও অসন্তুষ্ট। চলতি বছর তারা এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ করেছে। তাদের আশঙ্কা, ব্রাসেলস কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে চেষ্টা করছে। ফলে কৃষি উৎপাদনে তাদের ব্যয় বাড়বে এবং মুনাফা কমে যাবে। তারা দাবি করছেন, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আমদানি করা সস্তা পণ্য ইউরোপের তুলনায় নিম্নমানের।
তবে আলোচনায় অংশ নেয়া এক কর্মকর্তা জানান, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যা সমাধান করা এখনো বাকি। এটি সহজ নয়, কিন্তু আলোচনায় অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই চুক্তিটি চূড়ান্ত করা যাবে।















