বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনে ব্যবহৃত বড় জাহাজ সুপারট্যাংকারের ভাড়া এখন রেকর্ড উচ্চতায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এসব জাহাজের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জাহাজ কেনাবেচার বাজারেও। নতুন জাহাজের তুলনায় কয়েক বছর পুরনো সুপারট্যাংকারের দাম এখন বেশি। জাহাজ কেনাবেচার রেকর্ডে এমন ঘটনা এবারই প্রথম। খবর এফটি।
সুপারট্যাংকার মূলত অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত বিশাল আকারের জাহাজ। এর মধ্যে ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার বা ভিএলসিসি শ্রেণীর জাহাজ একেকটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করতে পারে। ফলে বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে এসব জাহাজের গুরুত্ব অনেক। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনে এমন একটি জাহাজের দৈনিক ভাড়া প্রায় ১২ লাখ ডলারে উঠেছে। এটিই এ রুটে এ ধরনের জাহাজের সর্বোচ্চ ভাড়ার রেকর্ড।
ভাড়া বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাহাজের দামে। সাধারণভাবে নতুন জাহাজের দাম পুরনো জাহাজের তুলনায় বেশি থাকে। কারণ নতুন জাহাজ দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায় ও এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও তুলনামূলক কম হতে পারে। কিন্তু এখন সেই স্বাভাবিক হিসাব বদলে গেছে। দ্রুত হাতে পাওয়া যাবে, এমন পুরনো জাহাজের জন্যই ক্রেতারা অনেক বেশি দাম দিতে রাজি হচ্ছেন। তথ্য বলছে, ৫ ও ১০ বছর বয়সী সুপারট্যাংকারের দাম দ্রুত বেড়েছে। এসব জাহাজ কেনাবেচার চুক্তিও এখন কয়েক সপ্তাহের বদলে কয়েক দিনের মধ্যে হয়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে ২০১৬ সালের আগে তৈরি কয়েকটি সুপারট্যাংকার ১৫ কোটি ডলার বা তার বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। অথচ নতুন করে তৈরি একটি সুপারট্যাংকারের গড় দাম প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
এখানে জাহাজের বয়সের চেয়েও অন্য একটি বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেটি হলো জাহাজটি কত দ্রুত নতুন মালিকের হাতে পৌঁছতে পারবে। শিপব্রোকার ব্রেমার জানায়, বর্তমান বাজারে জাহাজের দামের ওপর বয়সের প্রভাব খুব কম। দ্রুত সরবরাহ করা যাবে এমন জাহাজের দামই বেশি।
এর একটি বড় উদাহরণ পাওয়া গেছে সম্প্রতি। গ্রিসের ধনকুবের জর্জ প্রকোপিউর প্রতিষ্ঠান ডাইনাকমের মালিকানাধীন একটি ট্যাংকার দ্রুত সরবরাহের শর্তে ২০ কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সর্বোচ্চ দামের একটি। আরেকটি ট্যাংকার, যা আগামী অক্টোবরে নতুন মালিকের কাছে সরবরাহ করার কথা, সেটি বিক্রি হয়েছে ১৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের এমন পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হলো তেল পরিবহনের চাহিদা ও জাহাজের স্বল্পতা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলো এখন নিজেদের বহরে আরো বেশি জাহাজ যুক্ত করতে চাইছে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রফতানির সময় জাহাজের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো যাবে।
কোম্পানিগুলো এতদিন তেল পরিবহনে অনেকাংশে অন্য জাহাজ মালিকদের কাছ থেকে ট্যাংকার ভাড়া করত। ফলে বাইরের জাহাজ মালিকদের ওপর নির্ভর করতে হতো বেশি। এখন নিজেদের বহরে জাহাজ বাড়ানোর মাধ্যমে সে নির্ভরতা কমাতে চাইছে মধ্যপ্রাচ্যের এসব রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি।
জাহাজ ব্রোকারদের তথ্যানুযায়ী, এ বাজারে কুয়েতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ও ইরাকের অপরিশোধিত তেল পরিবহনে জাহাজ কিনতে আগ্রহী বিভিন্ন ক্রেতা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি অ্যাডনকও বড় ক্রেতা হিসেবে বাজারে এসেছে। সামুদ্রিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ড্রিউরির তথ্যানুযায়ী, দুই মাসে অ্যাডনক অন্তত ছয়টি সুপারট্যাংকার কিনেছে।
জাহাজ কেনার ক্ষেত্রে এত বেশি দাম দিতে চাওয়ার আগ্রহের পেছনে একটি কারণও রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে জাহাজ ভাড়ার আয় এত বেশি যে একটি জাহাজ কেনার খরচ কয়েক মাসের মধ্যেই উঠে আসতে পারে। সিএমবি টেকের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার স্যাভেরিসের হিসাবে, একটি জাহাজ থেকে ছয় মাসে প্রায় ১০ কোটি ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।
প্রতিবেদন বলছে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল কোম্পানিগুলোই নয়, অন্য বড় প্রতিষ্ঠানও এখন ট্যাংকার কিনছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিনোকর বছরের শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের জাহাজ কিনেছে।
পণ্যবাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ট্রাফিগুরাও চলতি বছর সুপারট্যাংকার কিনেছে। প্রতিষ্ঠানটি গত সপ্তাহে একটি সুপারট্যাংকার ব্যবসা তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। পণ্য পরিবহনের ওপর আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং নিজেদের মুনাফা সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যেই এসব জাহাজ কেনা হচ্ছে।
উচ্চ ভাড়ার বাজার কতদিন থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। জাহাজ মালিকদের একাংশ সতর্ক করেছেন, কোনো শান্তিচুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার স্বাভাবিকভাবে চালু হলে জাহাজের ভাড়া দ্রুত কমে যেতে পারে। তখন বর্তমানে যে অস্বাভাবিক উচ্চ দামে জাহাজ কেনাবেচা হচ্ছে, তারও বড় ধরনের পতন হতে পারে।










