কৃষকরা যেসব ফসল উৎপাদন করে তা আড়তদার, পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী, ফড়িয়া, খুচরা বিক্রেতা থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি স্তরে মূল্য বৃদ্ধি পায়। ফলে ভোক্তা উচ্চমূল্যে পণ্য ক্রয় করলেও কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান না। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক তার উৎপাদন খরচের চেয়েও কম মূল্যে পণ্য বিক্রিতে বাধ্য হন। ফলে কৃষক দিনে দিনে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তাই কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। ‘জাতীয় কৃষি বিপণন নীতি, ২০২২’-এর খসড়ায় এসব বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গিয়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এ নীতির খসড়াটি প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে এ খসড়াটির ওপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে। খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর তা বাস্তবায়ন হলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ই উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খসড়ায় বলা হয়, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল মার্কেট ডিরেক্টরি, বাজার তথ্য প্রচার, বাজার বিকেন্দ্রীকরণ, বিভিন্ন বাজারের দামের মধ্যে সামঞ্জস্যতা আনয়ন, প্যাকেজিং সুবিধা, সংরক্ষণ সংক্রান্ত জ্ঞান ইত্যাদি। এ নীতির আওতায় কৃষিপণ্যের মানসম্মত বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সরকার।
এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডিজিটাল মার্কেট ডিরেক্টরি প্রণয়ন ও প্রচার, উচ্চতর বাজার গবেষণা, নিয়মিতভাবে বাজার তদারকি এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। এছাড়া কৃষক, কৃষি ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের জন্য কৃষি ব্যবসায় তহবিল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। পণ্যের ধরন অনুযায়ী সঠিক ওজনে, সংখ্যায় বা পদ্ধতিতে কৃষিপণ্য বিপণন করা হবে। কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজারে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে বিভিন্ন ধরনের খাজনা, টোল বা কমিশন যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হবে। কৃষি ব্যবসায় কৃষক-ব্যবসায়ী-ভোক্তার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য বিস্তৃতি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খসড়ার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অধ্যায়ে বলা হয়, কৃষি বিপণন আইন-২০১৮ অনুযায়ী কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কর্তৃক কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন, কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন ও মূল্য সহায়তা প্রদানের সুযোগ রয়েছে। কৃষক উৎপাদিত কৃষিপণ্য আড়তদার, পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী, ফড়িয়া, খুচরা বিক্রেতা থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি স্তরে মূল্য বৃদ্ধি পায়। যার ফলে ভোক্তা উচ্চমূল্যে এসব পণ্য ক্রয় করলেও কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক তার উৎপাদন খরচের চেয়েও কম মূল্যে পণ্য বিক্রিতে বাধ্য হন। ফলে কৃষক দিনে দিনে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। কৃষকের আর্থিক লাভের নিশ্চয়তা, কৃষিকাজে আগ্রহ ধরে রাখা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকের জীবন মান উন্নয়নে আগামীতে বেশকিছু কার্যক্রম গ্রহণ করবে সরকার।
এরই অংশ হিসেবে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজন মনে করলে দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন আইন, বিধি ও নীতিগুলোর সমন্বয়ে সময়ে সময়ে নির্ধারিত কৃষিপণ্যের জন্য ন্যূনতম মূল্য সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য সহনীয় রাখতে এবং ভোক্তা ও কৃষি ব্যবসায়ীদের সার্বিক উপকারে কৃষি বিপণন আইন-২০১৮ অনুযায়ী কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন স্তরে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া কৃষিপণ্যের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং ন্যূনতম মূল্য সহায়তা প্রদানের বিষয়ে সরকার প্রয়োজনে উপজেলা, জেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি ও সাবকমিটি গঠন করা হবে।
কৃষিপণ্যের গুদাম ও সংরক্ষণাগার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের গতানুগতিক কৃষি এখন দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃষিপণ্যের সংগ্রহোত্তর ক্ষয়ক্ষতি কমানো, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ বা গুদামজাত বিপণনের অন্যতম প্রধান কাজ। তাই মৌসুমে যেন কৃষক কম দামে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য না হয় সে জন্য নির্ধারিত ফির বিনিময়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য পণ্য গুদামে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার। সংরক্ষিত পণ্যের বিপরীতে কৃষকদের সহজশর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করা হবে। গুদামে সংরক্ষিত পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তার জন্য ক্রেতা বা বাজার সংযোগ স্থাপনেও সহায়তা প্রদান করা হবে।
খসড়ায় বলা হয়, প্রয়োজনীয় বাজার সংযোগের অভাবে কৃষক বা উৎপাদক প্রকৃত ক্রেতা খুঁজে পায় না। আবার কখনো কাঙ্ক্ষিত বাজারে পণ্য পৌঁছতে পারে না। ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই বাজার সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে কৃষক, কৃষি ব্যবসায়ী, প্রক্রিয়াজাতকারী, পরিবহন ব্যবসায়ী, রফতানিকারক, ভোক্তা এবং সব অংশীজনের মাধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দেশের সব কৃষক, কৃষক গ্রুপ, বিশেষায়িত কৃষিপণ্য উৎপাদক, প্রক্রিয়াজাতকারী, ব্যবসায়ী ও পাইকারি বিক্রেতার তথ্য সংকলন, ওয়েবভিত্তিক ও সব শ্রেণীর জন্য সহজলভ্য করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষি ব্যবসায় যুক্ত হতে কৃষক, কৃষি ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের সহায়তা করা হবে। বড় কোম্পানি বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরাসরি কৃষক বা উৎপাদকের সঙ্গে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা পশ্চাত্সংযোগ ও চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ও সহায়তা প্রদান করা হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আ. গাফ্ফার খান বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি ভোক্তারা যেন সাশ্রয়ী দামে কৃষিপণ্য কিনতে পারেন এসব বিষয় মাথায় রেখে নীতিটির খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে নীতিটির খসড়ার ওপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও অংশীজনদের মতামত নেয়া হচ্ছে। প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে নীতিটি চূড়ান্ত করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। নীতিটি বাস্তবায়িত হলে কৃষক ভোক্তা উভয়ই লভবান হবে বলেও জানান তিনি।










