বেশির ভাগ জ্বালানি পণ্য বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান যখন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা ও পূর্বাভাস দিতে ব্যস্ত, তখন নিউইয়র্কভিত্তিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আগামী বছর প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। খবর অয়েলপ্রাইসডটকম ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্লাটস।
অলাভজনক ড্রিলিং, নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও অপ্রতুল মূলধনের কারণে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট কোম্পানি প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলন কমিয়ে আনতে পারে। এ ধারা চলমান থাকতে পারে আগামী বছরেও। উত্তোলন হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে ২০২১ সাল নাগাদ জ্বালানি পণ্যটির দাম বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছে গোল্ডম্যান স্যাকস।
গত কয়েক বছর ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলন বৃদ্ধিতে একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি পণ্যটির উদ্বৃত্ত সরবরাহ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। ফলে পণ্যটির দাম কমতে কমতে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট গ্যাসের দাম ২ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। যেখানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট গ্যাসের দাম ২ ডলার ৫০ সেন্ট হলেও কোম্পানিগুলোর পক্ষে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন খরচ তোলা দায় হয়ে ওঠে। ফলে লোকসানে পড়ছে খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দীর্ঘদিন ধরে পতনের মুখে রয়েছে। এরপর জ্বালানি পণ্যটির বাজারে লেগেছে নভেল করোনাভাইরাসের ধাক্কা। সংক্রমিত ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রায় সব দেশে। মহামারীটির প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাণিজ্যের ছক আঁকতে হচ্ছে নতুন করে। প্রভাবমুক্ত থাকেনি প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যও। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। ফলে এ খাতের ভোগান্তি আরো বাড়বে বৈ কমবে না। অব্যাহত লোকসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট কোম্পানি এ বছর থেকেই প্রাকৃতিক গ্যাসের ড্রিলিং কমিয়ে আনতে বাধ্য হতে পারে। ফলে পণ্যটির রেকর্ড উত্তোলন কমে যেতে পারে।
তবে উত্তোলন উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও চলতি বছর প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখছে না প্রতিষ্ঠানটি। নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে অর্থনৈতিক মন্দায় প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে বিদ্যমান সংকট চলতি বছর আরো প্রকট হয়ে উঠতে পারে। কেননা টানা কয়েক বছর অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির মজুদ বেড়ে গেছে। ফলে পণ্যটির চাহিদায় চাপ তৈরির সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ, যা দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আরো কমে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে গড়ে ১ ডলার ৬০ সেন্টে নামতে পারে। এছাড়া এ সময় এশিয়ার বাজারে সমপরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম কমে ২ ডলার ৫০ সেন্টে নামতে পারে।
তবে পরের বছর পাল্টে যেতে পারে পরিস্থিতি। নভেল করোনাভাইরাসের ধাক্কা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ফের চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। ফলে দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করতে পারে। এদিকে উত্তোলন ক্রমেই হ্রাসের কারণে পণ্যটির মজুদ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসতে পারে। ফলে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে। এতে ২০২১ সালের গ্রীষ্মকাল নাগাদ পণ্যটির দামে উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে উত্তোলন হ্রাস, অন্যদিকে চাহিদা বৃদ্ধি—এ দুইয়ের মিশ্রণে আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে ভারসাম্য ফিরতে পারে। উদ্বৃত্ত সরবরাহ কমে যাবে। তথ্যমতে, ২০২১ সালের গ্রীষ্ম আসার আগেই দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির মজুদ কমে মাত্র ২ লাখ ২০ হাজার কোটি ঘনফুটে নামতে পারে। সে হিসেবে এ বছরের গ্রীষ্ম থেকে আগামী বছরের গ্রীষ্মের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ দৈনিক গড়ে ২৪০ কোটি ঘনফুট কমে যেতে পারে। অথচ এ সময়ের মধ্যে দেশটিতে পণ্যটির চাহিদা দৈনিক গড়ে ৫০০ কোটি ঘনফুট বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি পূর্বাভাস করে যে প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান দরপতনে থাকা বাজার দীর্ঘমেয়াদি নয়। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন শীতে (চলতি বছরের শেষ দিক থেকে আগামী বছরের প্রথম দিক পর্যন্ত) প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট গ্যাসের দাম বেড়ে ৩ ডলার ৫০ সেন্টে উন্নীত হতে পারে। শীতকালের তুলনায় গ্রীষ্মে পণ্যটির দাম তুলনামূলক কমে যায়। ফলে ২০২১ সালের গ্রীষ্মে জ্বালানি পণ্যটির দাম কিছুটা কমে মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট প্রতি ৩ ডলার ২৫ সেন্টে দাঁড়াতে পারে। শীতে ফের পণ্যটির দামে চাঙ্গা ভাব ফিরতে পারে।









