বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) দুই বছর আগে জেলার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্প এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স দেয়া বন্ধ করে দেয়। সেই সঙ্গে বন্ধ রাখা হয়েছে পুরনোদের লাইসেন্স নবায়নও। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বরিশালে শিল্পায়নের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এ ট্রেড লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতায় নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিসিসির নতুন লাইসেন্স বন্ধের সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জামাল হোসেন। গাজীপুরে ‘চকচকে
বল ও ডিটারজেন্ট পাউডার’ উৎপাদন কারখানা ছিল। ২০২০ সালে শুরুতে কারখানাটি নিজ এলাকার বিসিক শিল্প নগরে স্থানান্তর করেন। কিন্তু ট্রেড লাইসেন্স না পাওয়ায় গত দুই বছরে তিনি উৎপাদনে যেতে পারেননি। একইভাবে সব প্রস্তুতির পরও উৎপাদনে যেতে পারছে না বিএমসি টেক্সটাইল মিল লিমিটেডের কমফোর্টার কারখানা এবং বরিশালের প্রথম গার্মেন্টস নিমর্যাক ডিজাইন।
এ অচলাবস্থা নিরসনে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার আমিন উল আহসান বিসিক ও বিসিসির মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সমাধান হয়নি।
বিসিকের উপব্যবস্থাপক জালিস মাহমুদ বলেন, ‘শিল্প
আইনে এককভাবে বিসিক কর্তৃপক্ষ এবং প্লট মালিক পৃথকভাবে হোল্ডিং ট্যাক্স দেয়ার সুযোগ রয়েছে। সম্মিলিতভাবে দেয়া হলে প্লট মালিকরা আনুমানিক হারে বিসিক কর্তৃপক্ষকে অর্থ পরিশোধ করবেন। কিন্তু বরিশাল বিসিকের ব্যবসায়ীরা এতে রাজি না হওয়ায় জটিলতা কাটছে না। আশা করি খুব শিগগির এর সমাধান হবে।’
ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণ জানতে চাইলে বরিশাল বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খান বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা
বিসিককে বার্ষিক আড়াই শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ দেন। তাই আলাদাভাবে হোল্ডিং ট্যাক্স দেয়ার শর্ত মেনে নেয়া সম্ভব না। পুরো শিল্প নগরের হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের দায়িত্ব বিসিক কর্তৃপক্ষের।’
বিসিক বরিশালের সূত্র অনুযায়ী, ১৩০ একর ৬১ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বরিশাল শিল্পনগরীতে বর্তমানে ১১৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। বিসিকের শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. গোলাম রসুল রাসেল বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত গার্মেন্টস ও ইলেকট্রিক পণ্যেরসহ ৩০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্লট বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তও করা হয়েছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি ট্রেড লাইসেন্স পায় তবে চলতি বছর তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এ সংকটের শুরু হয় ২০২০ সালের অক্টোবরে। সে সময় নিচু জমি ভরাট করে নতুন প্লট তৈরি এবং সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে বিসিকে ৭৪ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তখন মূল সড়কের পাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণে ৪ ফুট জমি ছেড়ে দেয়ার দাবি তোলে বিসিসি। এ নিয়ে বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ও ফরচুন সুজ ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মিজানুর রহমানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং হামলা-মামলা পর্যন্ত গড়ায়। কারণ তার ভাই ছিলেন উন্নয়ন প্রকল্প কাজের ঠিকাদার। এরপর থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়ার অজুহাত দেখিয়ে বিসিসি ট্রেড লাইসেন্স দেয়া বন্ধ করে দেয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার সুপারিনটেনডেন্ট মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা
বিসিকের কাছে ট্যাক্স বাবদ কয়েক লাখ টাকা পাব। তারা টাকা দিচ্ছে না। তাই আমরাও সেখানকার কোনো ব্যবসায়ীকে ট্রেড লাইসেন্স দেয়া ও নবায়ন বন্ধ রেখেছি।’
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘বরিশালে
নতুন করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এ বিভাগে ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে পারে। সে সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া কাম্য নয়।’ ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়ে তিনি বিসিসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য ও বরিশাল বিএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, ‘পদ্মা
সেতুকে ঘিরে এ অঞ্চলে গার্মেন্টসসহ মত্স্য, কৃষি, পর্যটন, অবকাঠামো, ব্লু ইকোনমিসহ সব খাতের প্রসার ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া পায়রা বন্দরের আমদানি-রফতানির প্রভাব বরিশালের মানুষের ওপর পড়বে। পায়রা তাপবিদ্যুৎ ও ভোলার গ্যাস এ উন্নয়নকে আরো একধাপ এগিয়ে নেবে। তবে বিসিসির ট্রেড লাইসেন্স জটিলতা সব অর্জন বিলীন করে দিতে পারে। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান হওয়া জরুরি।’










