দেশের শিল্প-কারখানার ওপর ২০১২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) একটি সমীক্ষা চালায়। সেই সমীক্ষা অনুসারে, দেশে কারখানার সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৭৯২। এর মধ্যে অতিক্ষুদ্র উদ্যোগে ১৭ হাজার ৩৮৪টি, ক্ষুদ্র উদ্যোগে ১৫ হাজার ৬৬৬ এবং মাঝারি উদ্যোগে ৬ হাজার ১০৩টি শিল্প-কারখানা পরিচালিত হয়।

বিবিএসের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) একটি জরিপে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতের অবদান ২৫ শতাংশ এবং উৎপাদন খাতে অবদান ৪০ শতাংশ। কিন্তু এর পরও এ খাতের অবদান নিয়ে হয়নি সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান। যে কারণে বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে শুধু এসএমই খাতের অবদান কতটুকু সে তথ্য এখনো জানা যায়নি।

বিগত কয়েক বছর ধরে বেশকিছু সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। যার মধ্যে রয়েছে কভিড-১৯-এর মহামারী, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, দেশে চলমান মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের চাপ, বাড়তি সুদহার। এছাড়া নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কভিডের সময় অনেক উদ্যোক্তাই নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। আবার মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংক সুদের হারও বেড়েছে। যে কারণে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও বিপাকে পড়তে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর নতুন করে সংকট দেখা দেয়। বিশেষত কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা পড়েন বেশি সমস্যায়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের (এসএমই) নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে আসলে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। একেক সময় একেক সংস্থা বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এটি আসলে বড় একটি সমস্যা। কোনো প্রকল্প হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে আসলে আমাদের মূল সংখ্যাটা জানার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখনো সে রকম কোনো ডাটা আমাদের কাছে নেই।’

এসএমই ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ নিয়ে পরিসংখ্যান পরিচালনা করবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এসএমই ফাউন্ডেশন পরিসংখ্যানের এ বিষয়ে অবগত। এরই মধ্যে তারা কাজ শুরু করে দিয়েছে। এটি আসলে অনেক বড় কাজ। এসএমই ফাউন্ডেশনের একার পক্ষে পুরো পরিসংখ্যানটি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই আমরা বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে এরই মধ্যে কথা বলা শুরু করেছি। তারা আমাদের সঙ্গে কাজ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’

সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সে সময় কারফিউ এবং বেশ কয়েকদিন ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় লোকসানের মধ্যে পড়তে হয় অনেক উদ্যোক্তাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কভিডকালের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন সে সময়ে। অনেকে ঋণের কিস্তিও সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না। যে কারণে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের এসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও কর্মসংস্থান নিয়ে ২০১৯ সালে উৎপাদন শিল্প জরিপ পরিচালনা করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যা ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপের তথ্যে দেখা যায়, দেশে এসএমই শিল্প-কারখানার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার। এর মধ্যে ক্ষুদ্র শিল্প ২৩ হাজার ৩০৬টি ও মাঝারি শিল্প ৩ হাজার ১৭৮টি। এছাড়া ১৬ হাজার ৭৭০টি অতিক্ষুদ্র শিল্প ও ২ হাজার ৮৫৬টি ভারী শিল্প রয়েছে।

বিসিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ। এর মধ্যে বড় শিল্পের ১১ দশমিক ২০ শতাংশ, এমএসএমইর ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং কুটির শিল্পের অবদান ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান নিয়ে প্রতি বছরই সার্ভে করা হয়। যদিও তা আলাদাভাবে করা হয় না। তবে এসএমই খাত নিয়ে আমরা আগামীতে সার্ভে পরিচালনা করব। এরই মধ্যে প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আশা করছি আগামী বছরের মধ্যে পরিসংখ্যানটি প্রকাশ করতে পারব।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকার কারণে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান কতটুকু সে সম্পর্কে খাতসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কোন খাতে কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া লাগবে, কোন ধরনের প্রকল্প এ খাতের উন্নতিতে সাহায্য করবে—এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।